Sun. Sep 6th, 2026

তুমি জানোনি

PDF Download (Open Access: Free)

(File Size 6 MB)

27 Downloads

DOI: https://doi.org/10.64907/xkmf.book.b2.15.08.26

প্রকাশকের কথা

তুমি জানোনি কেবল একটি প্রেমের কবিতার বই নয়; এটি সময়, স্মৃতি এবং না-বলা অনুভূতির এক দীর্ঘ কাব্যিক যাত্রা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একটি প্রথম দেখা থেকে জন্ম নেওয়া অনুভব সময়ের সঙ্গে দূরত্ব, স্মৃতি ও মমতায় রূপ নিয়েছে। বহু বছর পেরিয়েও সেই স্মৃতি হারিয়ে যায়নি; বরং নতুন ভাষায় ফিরে এসেছে কবিতার পাতায়।

এই গ্রন্থে ভালোবাসা কোনো অধিকার বা প্রাপ্তির দাবি নয়। এখানে ভালোবাসা কখনো অপেক্ষা, কখনো নীরবতা, কখনো দূর থেকে প্রিয় মানুষের ভালো থাকাকে কামনা করা।

পাঠক এই কবিতাগুলোর মধ্যে হয়তো লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতির পাশাপাশি নিজের জীবনের কোনো হারিয়ে যাওয়া সময়, মুখ কিংবা না-বলা কথাকেও খুঁজে পাবেন।

প্রকাশক

আগস্ট ২০২৬

লেখকের কথা

কিছু কথা সময়মতো বলা হয় না। কিছু অনুভূতি প্রকাশের আগেই স্মৃতি হয়ে যায়। আর কিছু মানুষ জীবন থেকে দূরে চলে গেলেও মনের কোনো এক নির্জন জায়গায় থেকে যায়।

তুমি জানোনি তেমনই কিছু না-বলা কথার ফিরে আসা। যে অনুভূতির জন্ম বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে, তাকে আমি কোনো প্রাপ্তি বা অধিকারের গল্প হিসেবে লিখিনি। সময় ও দূরত্ব পেরিয়ে স্মৃতিতে যা রয়ে গেছে, কবিতায় শুধু সেটুকুই ধরতে চেয়েছি।

এ বইয়ের কবিতাগুলো তাই কাউকে ফিরে পাওয়ার আহ্বান নয়; বরং একসময় নিঃশব্দে ভালোবেসেছিলাম-সেই অনুভূতির প্রতি আমার স্বীকারোক্তি।

সব কথা যাকে নিয়ে লেখা, তাকে সব কথা জানতেই হবে-এমন নয়।

কিছু কথা কবিতা হয়ে থাকাই হয়তো সুন্দর।

ফারিস হাকিম

আগস্ট ২০২৬

তুমি জানো কি

প্রথম দেখা ১৯৯০

তোমায় দেবো নাকো তৃপ্তি বিভোর সুখের মেতে,
অন্তর আমার সইবে নাকো তোমার বেদনার চিৎকারে।

সেদিন তোমায় প্রথম দেখি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে,
কী যে হলো-আজও তাহার উত্তর খুঁজি গোপনে।
চারদিকে কত মুখ ছিল, কত কোলাহলের ঢেউ,
তবু কেন সেই জনারণ্যে চোখে পড়লে শুধু তুমি একা কেউ।

তুমি কি জানো-একটি ক্ষণও দীর্ঘ জীবন হতে পারে?
একটি চাহনি ত্রিশটি বছর নীরব হয়ে জেগে থাকে?
তুমি হেঁটে গেলে-পথের ধুলো পথেই পড়ে রইল,
শুধু আমার তরুণ হৃদয় তোমার পিছু হারিয়ে গেল।

সেদিন তোমার চোখে আমি কী দেখেছিলাম, জানি না,
হয়তো কোনো দূর আকাশের অচেনা এক ঠিকানা।
হয়তো ছিল সাধারণই-আমিই অসাধারণ করে
রেখেছিলাম সেই মুহূর্ত বুকের গোপন ঘরে।

বলিনি তোমায়-“ভালোবাসি”, শব্দটি বড় ছোট,
আমার কাছে ভালোবাসা ছিল অনন্ত কোনো শপথ।
তোমার হাসির পাশে যেন আমার দাবি নাহি থাকে,
তোমার চলার স্বাধীনতায় আমার ছায়া নাহি আঁকে।

তবু লিখেছি-পাতার পরে পাতা, রাত্রির পরে রাত,
তোমার নামে গড়ে উঠেছিল আমার গোপন কাব্যপ্রাসাদ।
কালির অক্ষর জানত শুধু অপ্রকাশিত সেই কথা-
একটি মেয়ের প্রথম দেখায় বদলে গিয়েছিল জীবনের ব্যাকরণটা।

সে পাণ্ডুলিপি আজ হারিয়েছে-কোথায়, কে তা জানে!
হয়তো কোনো পুরোনো বাক্সে, হয়তো বিস্মৃতির গানে।
কিন্তু আশ্চর্য-কাগজ হারায়, অক্ষর মুছে যায়,
প্রথম দেখার সেই বিকেলটি কেন কখনো হারায় নাই?

তারপর জীবন নদীর মতো কত দূরে বয়ে গেল,
কত বসন্ত এলো-গেল, কত পরিচিত মুখ বদলাল।
তুমি বলেছিলে-দূরে থেকো; আমি দূরেই থেকে গেলাম,
তোমার ইচ্ছার সীমানাটুকু নীরবে মেনে নিলাম।

সামনে গিয়ে দেখিনি তোমায় প্রায় ত্রিশটি বছর,
তবু স্মৃতির বিশ্ববিদ্যালয়ে তুমি সেই প্রথম প্রহর।
সেখানে এখনো তরুণ তুমি, আমিও তরুণ কবি,
একটি মুহূর্তের ভিতর দাঁড়িয়ে-দুজনেই চিরনবীন ছবি।

আজ আমাদের চুলে হয়তো সময় রুপালি রেখা আঁকে,
ষাটের কাছাকাছি জীবন এসে পুরোনো দরজায় ডাকে।
তবু ১৯৯০-এর সেই ছেলেটি আমার ভিতর আজও
প্রথম তোমায় দেখার ক্ষণে থমকে দাঁড়ায়-নিঃশব্দে।

আমি তোমায় পাওয়ার জন্য ভালোবাসিনি কোনোদিন,
পাওয়া-না-পাওয়ার হিসাব করলে প্রেম হয়ে যায় ঋণ।
তুমি যেখানে ভালো থেকো-সেই হোক আমার প্রার্থনা,
আমার কাছে প্রেম মানে তো তোমার প্রতি কোনো দাবি না।

যদি কোনোদিন বাতাস বয়ে পুরোনো ক্যাম্পাস ছুঁয়ে যায়,
যদি কোনো পরিচিত পথ হঠাৎ তোমাকে পেছন ফিরে তাকায়-
জেনো, সেই পথের কোনো এক বিস্মৃত প্রান্তরে
একটি প্রথম দেখা আজও কবিতা হয়ে ঝরে।

তোমায় দেবো নাকো তৃপ্তি বিভোর সুখের মেতে,
তোমার স্বাধীন আকাশ থাকুক তোমারই হাতে।
শুধু আমার যতদিন এই শব্দেরা বেঁচে রবে-
প্রথম দেখার সেই মেয়েটি আমার কবিতায় থেকে যাবে।

তোমাকে দেখার পরের দিন

সকাল হলো-অথচ কেন সকালটা আর আগের মতো নয়,
জানালাজুড়ে রোদের ভেতর কার যেন মুখ কথা কয়।
গতকাল তুমি হেঁটে গেলে-অতি সাধারণ পথ ধরে,
আজ সে পথই কেমন যেন ডাকছে আমায় নাম না ধরে।

রাতটা আমার কেটেছিল কি ঘুমে, না কোনো ঘোরে?
চোখ বুজলেই তোমার মুখটি ভেসে উঠেছে অন্ধকারে।
আমি তখন বুঝিনি প্রেম-কী তার সংজ্ঞা, কী পরিচয়,
শুধু বুঝেছি, তোমায় দেখার পর থেকে আমি আর আগের আমি নই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে আবার সকালবেলা যাই,
অকারণেই পরিচিত মুখের ভিড়ে তোমাকেই খুঁজে বেড়াই।
ক্লাসের ঘণ্টা বাজছে দূরে, বন্ধুরা সব কথা বলে,
আমার মনটি পড়ে আছে গতকালের সেই পথের তলে।

কত মেয়ে হেঁটে যায়-কত রঙের পোশাক পরে,
কত হাসি বাতাস ছোঁয়, কত কথা যায় কানে ঝরে;
তবু কেন একটি মুখই সমস্ত মুখকে ঢেকে দেয়?
কেন তোমার না-থাকাটাও তোমার থাকার মতো মনে হয়?

বই খুলেছি-অক্ষরগুলো আজকে বড় অবাধ্য,
একটি লাইন পড়তে গিয়ে হারিয়ে ফেলি পরের বাক্য।
পাতার সাদা শূন্যতায় কে যেন তোমার ছবি আঁকে,
কলম আমার নিজের অজান্তে থেমে থাকে তোমার নামে।

তখনও তোমার নামটি হয়তো হৃদয় জানত না,
তোমার ঘর, তোমার পৃথিবী-কিছুই আমার জানা না।
জানতাম শুধু, গতকাল এক অপরিচিত মুখের কাছে
আমার সমস্ত পরিচিত পৃথিবী হঠাৎ অপরিচিত হয়েছে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল এলো-ক্যাম্পাস হলো ছায়াময়,
যে পথে তোমায় প্রথম দেখি, সেই পথ ধরে হাঁটি নির্ভয়।
ভাবি-হয়তো আবার তুমি ওই বাঁকটিতে এসে দাঁড়াবে,
হয়তো আমার দিকে নয়-অন্য কোথাও তাকিয়ে চলে যাবে।

তাতেই বা কী? তোমার চোখে চোখ রাখার দাবি ছিল না,
তোমার পাশে হাঁটার কোনো অধিকারও চাইনি সেদিন।
শুধু দূর থেকে আর একবার তোমাকে দেখার ইচ্ছাটুকু
কী আশ্চর্য এক ব্যাকুলতায় ভরিয়ে দিয়েছিল তরুণ বুক।

সন্ধ্যা নামল। তুমি এলে না। পথটাও হলো ফাঁকা,
আমি ফিরলাম-তবু মনে হলো কিছু যেন রয়ে গেল একা।
কী রেখে এলাম জানি না-কোনো স্বপ্ন, কোনো অপেক্ষা?
নাকি আমার প্রথম যৌবন রেখে এলাম তোমার দেখা পথে?

সেই রাতে প্রথম বুঝি-অপেক্ষারও জন্মদিন আছে,
কারও অনুপস্থিতি কখনো উপস্থিতির চেয়েও কাছে।
মানুষকে একদিন দেখেও পরদিন তাকে খোঁজা যায়-
একটি মুখ না দেখার ব্যথা বুকের ভেতর বাজতে চায়।

আজ এত বছর পরে যখন সেই সকালটি মনে পড়ে,
ভাবি-কী সরল ছিলাম আমি সেই উনিশশো নব্বইয়ের ভোরে!
জানতাম না, তোমাকে খোঁজা একদিন থামিয়ে দিতে হবে,
জানতাম না, না-দেখার মধ্যেও এত দীর্ঘ ভালোবাসা রবে।

যদি সেদিনের আমি জানত আজকের আমার কথা-
হয়তো অবাক হয়ে বলত, “এতদিনও থাকে প্রথম দেখা?”
আমি তাকে শুধু বলতাম-“সব ভালোবাসা কাছে ডাকে না,
কিছু ভালোবাসা দূরে থেকেও সারাজীবন ফুরায় না।”

ক্যাম্পাসের সেই পথ

ক্যাম্পাসের সেই পথটি আজও কি তেমন আছে,
দুপুর শেষে নরম রোদ কি গাছের পাতায় নাচে?
আজও কি ক্লাস ভাঙলে সেখানে তরুণেরা ভিড় করে,
কেউ কি কাউকে প্রথম দেখে হঠাৎ থমকে দাঁড়ায় পথের ’পরে?

আমার কাছে সেই পথটি পথ ছিল না আর,
তুমি একদিন হেঁটেছিলে-তাই হয়েছিল অন্যরকম তার।
ইট-পাথরের সাধারণ পথ, ধুলো-মাখা চেনা বাঁক,
তোমার পায়ের ছোঁয়া পেয়ে হয়ে গেল স্মৃতির পবিত্র ফাঁক।

কতবার যে হেঁটেছি পরে সেই একই পথ ধরে,
কখনো ধীরে, কখনো শুধু তোমায় দেখব বলে।
কাউকে বলিনি কেন আমার ক্লাস শেষে এত দেরি,
কেন অকারণ ঘুরে বেড়াই-কীসের আশায় পথের ফেরি।

তুমি হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে যেতে,
আমি হয়তো অনেক দূরে-চোখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে পথে।
তোমার হাসির শব্দটুকুও যদি বাতাস বয়ে আনত,
আমার সমস্ত বিকেল তখন অকারণেই ভালো লাগত।

কখনো তুমি সামনে এলে আমি অন্যদিকে চাইতাম,
মনের ভেতর ঝড় উঠলেও বাইরে শান্তই থাকতাম।
কী আশ্চর্য সেই বয়স-কাছে যেতে মন যে চায়,
আবার কাছে এলেই কেন সমস্ত ভাষা হারিয়ে যায়!

আমি চাইনি পথ আটকাতে, চাইনি তোমার সময় নিতে,
শুধু একই পথে কিছুদূর নীরবে চেয়েছি হেঁটে যেতে।
তুমি জানতে না-তোমার কয়েকটি নিরীহ পদক্ষেপ
কারও জীবনে লিখে দিচ্ছে অদৃশ্য এক দীর্ঘ অনুচ্ছেদ।

কখনো তুমি আসতে না-তবু পথটি ছেড়ে যেতাম না,
যুক্তি দিয়ে তরুণ মনকে তখন বোঝাতে পারতাম না।
ভাবতাম, ওই বাঁকের পরে হঠাৎ যদি দেখা মেলে,
এক মুহূর্তের সেই দেখাতেই দিনটি যাবে আলো জ্বেলে।

বৃষ্টি এলে সেই পথটার রং বদলে যেত ধীরে,
ভেজা পাতার গন্ধ নামত বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে।
তখনও মনে হতো-এই বৃষ্টির কোনো এক প্রান্তে
তুমিও বুঝি দাঁড়িয়ে আছো ছাতা হাতে, আপনমনে।

শীতের সকালে কুয়াশাতে পথ হারাত দূর সীমানা,
তবু তোমাকে চিনতে আমার প্রয়োজন হতো না ঠিকানা।
শত মানুষের চলার মাঝে একটি চলন আলাদা ছিল-
দূর থেকেই বুঝতাম আমি, ওই তো তুমি-হৃদয় বলত।

বসন্ত এলে কৃষ্ণচূড়ায় আগুন ধরত কি না মনে নেই,
মনে আছে শুধু তোমার উপস্থিতিতে রঙিন হতো দিনগুলো সেই।
প্রকৃতির কত সৌন্দর্য তখন চোখের সামনে ছিল,
তবু আমার তরুণ চোখে একটি মানুষই ঋতু হয়ে মিলল।

তারপর একদিন সেই পথেই সময় বদলাতে থাকে,
কাছে যাওয়ার ইচ্ছাগুলো নীরব হতে শেখে।
যে পথ একদিন তোমাকে দেখার অজুহাত হয়েছিল,
সেই পথই পরে তোমাকে না-দেখার শিক্ষা দিয়েছিল।

জীবন আমাকে নিয়ে গেছে কত শহর, কত পথে,
কত প্রশস্ত রাজপথ পেরিয়েছি প্রয়োজনের রথে।
তবু পৃথিবীর কোনো পথই সেই পথটির মতো নয়-
যেখানে প্রথম অপেক্ষা শিখেছিল এক তরুণ হৃদয়।

আজ যদি আবার ফিরে যাই সেই পুরোনো প্রাঙ্গণে,
হয়তো কিছুই চিনব না সময়ের নতুন আয়োজনে।
নতুন ভবন, নতুন মুখ, নতুন প্রজন্মের কোলাহল-
শুধু আমার চোখ খুঁজবে একটি হারিয়ে যাওয়া বিকেল।

হয়তো দাঁড়াব সেই জায়গাটায়, যেখানে দাঁড়াতাম চুপ করে,
কিন্তু এবার তোমার আসার অপেক্ষা করব না পথের ’পরে।
কারণ এতদিনে বুঝেছি-স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনতে নেই,
যে মুহূর্ত সুন্দর হয়ে গেছে, তাকে বর্তমানের কাছে চাইতে নেই।

তবু সেই পথকে মনে মনে একটি কথা বলে আসব-
“তুমি তাকে দেখেছিলে প্রতিদিন, যখন আমি শুধু দূর থেকে ভালোবাসতাম।
আমি চলে গেছি বহু দূরে, সময়ও গেছে বহুদূর-
তুমি আমার হয়ে রেখো সেই তরুণীর কয়েকটি পদচিহ্নের নূপুর।”

আর যদি কোনো সন্ধ্যায় বাতাস পুরোনো পাতায় কথা কয়,
আমার হারানো বয়সটুকু যদি সেখানে ফিরে রয়-
পথ, তুমি তাকে বলো না আমার দীর্ঘ অপেক্ষার কথা,
শুধু বলো-এক তরুণ একদিন এখানে শিখেছিল
ভালোবাসার জন্য পাশাপাশি হাঁটতেই হয় না।

আমার অপ্রকাশিত পৃথিবী

তুমি জানোনি-তোমার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া সেই ছেলেটি
কত কথা জমিয়ে রাখত বুকের ভেতর,
মুখে যার ছিল নিতান্ত সাধারণ নীরবতা,
অথচ অন্তরে প্রতিদিন জন্ম নিত
তোমাকে ঘিরে নতুন নতুন শব্দের ঘর।

তুমি জানোনি-ক্লাসের ভিড়ে তোমার একটি হাসি
কীভাবে বদলে দিত আমার সমস্ত দিন,
সকালটা হতো একটু বেশি উজ্জ্বল,
বিকেলটা দীর্ঘ, সন্ধ্যাটা উদাসীন-
আর রাত নামলেই কাগজের কাছে বসে
আমি হয়ে উঠতাম অন্য এক নবীন।

তুমি জানোনি-আমি তোমাকে দেখতাম
তোমার অগোচরে, অনেক দূর থেকে;
এমন নয় যে চোখ শুধু রূপ খুঁজেছিল-
কী এক অজানা মায়া ছিল তোমার চলায়,
কী এক শান্ত পৃথিবী ছিল তোমার মুখে,
যা আমাকে প্রতিদিন ফিরিয়ে আনত
একই পথের একই বাঁকে।

তুমি জানোনি-তোমার নামটি উচ্চারণ করতেও
কেমন এক সংকোচ জেগে উঠত মনে,
যেন নামটি বললেই সবাই জেনে যাবে
আমার গোপন পৃথিবীর কথা;
তাই বন্ধুদের আড্ডায় কত নাম এসেছে-গেছে,
শুধু তোমার নামটি রেখে দিয়েছি
হৃদয়ের সবচেয়ে নির্জন পাতায়।

তুমি জানোনি-কতবার কথা বলতে চেয়েছি,
কতবার সাজিয়েছি প্রথম বাক্যটি মনে-
“কেমন আছ?”-এতটুকু বলাও
কেন যে পাহাড় ডিঙানোর মতো মনে হতো!
তুমি কাছে এলে প্রস্তুত সব শব্দ
এক নিমেষে কোথায় হারিয়ে যেত,
আর তুমি চলে গেলে সেই শব্দগুলোই
আমাকে সারারাত প্রশ্ন করত।

তুমি জানোনি-একদিন তোমার পোশাকের একটি রং
আমার সারাদিনের স্মৃতি হয়ে ছিল,
একদিন তোমার চুলে বাতাস লেগেছিল-
সেই সামান্য দৃশ্যও কত পঙ্‌ক্তির জন্ম দিয়েছিল।
তোমার কাছে যা ছিল একটি সাধারণ দিন,
আমার কাছে তা হয়ে উঠেছিল
লিখে রাখার মতো কোনো উৎসব।

তুমি জানোনি-তোমাকে নিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম আমি,
একটি কবিতা নয়, দুটি কবিতা নয়-
পাতার পরে পাতা জমে উঠছিল ধীরে;
তুমি তখন হয়তো নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত,
আর আমি নিঃশব্দে তোমাকে বসিয়ে দিচ্ছিলাম
আমার অক্ষরের গভীরে।

সেখানে তোমাকে আমি কোনোদিন আমার করিনি,
কোনো কল্পনার শিকল পরাইনি তোমার পায়ে;
শুধু লিখেছি-তুমি যেমন করে হেঁটে যাও,
তেমন করেই হেঁটে যেও স্বাধীনতায়।
আমার ভালোবাসা যদি সত্যিই ভালোবাসা হয়,
তবে সে কেন তোমার আকাশ ছোট করে দেয়?

তুমি জানোনি-কখনো তোমার মন খারাপ দেখলে
আমার নিজের আনন্দটুকুও ম্লান হয়ে যেত,
যদিও তোমার দুঃখের কারণ জানার
কোনো অধিকার আমার ছিল না।
তবু মনে হতো-
পৃথিবীর সমস্ত সুখ যদি হাতে থাকত,
এক মুঠো তোমার পথে রেখে আসতাম,
নামটি লিখতাম না।

হয়তো এই জন্যই কোনো এক রাতে লিখেছিলাম-

“তোমায় দেবো নাকো তৃপ্তি বিভোর সুখের মেতে,
অন্তর আমার সইবে নাকো তোমার বেদনার চিৎকারে।”

আজ এত বছর পরে শব্দ দুটির দিকে তাকিয়ে
আমি সেই তরুণটিকে আবার দেখতে পাই;
সে ভালোবাসার অর্থ ঠিকমতো জানত কি না জানি না,
কিন্তু এটুকু বুঝেছিল-
প্রিয় মানুষের চোখে জল রেখে
নিজের সুখের আয়োজন করা যায় না।

তুমি জানোনি-তোমাকে দেখার জন্য
কত অজুহাত বানিয়েছে আমার মন;
একটু আগে ক্যাম্পাসে আসা,
একটু পরে বাড়ি ফেরা,
একই করিডোর দিয়ে অকারণে দ্বিতীয়বার যাওয়া-
সবকিছুর পেছনে ছিল একটি ক্ষুদ্র সম্ভাবনা:
হয়তো তোমাকে একবার দেখা যাবে।

আর দেখা হয়ে গেলে?

কিছুই ঘটত না।

তুমি তোমার মতো চলে যেতে,
আমি আমার মতো দাঁড়িয়ে থাকতাম;
কেবল বুকের মধ্যে অদ্ভুত এক আনন্দ নিয়ে ভাবতাম-
আজকের দিনটিও তবে বৃথা গেল না।

তুমি জানোনি-
তোমার সঙ্গে আমার যত কথোপকথন হয়েছিল,
তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি কথা
আমি তোমার সঙ্গে বলেছি মনে মনে।
সেখানে তুমি কখনো বিরক্ত হওনি,
কখনো তাড়া ছিল না তোমার,
আমি বলেছি আমার যত অসমাপ্ত কথা-
আর আমার কল্পনার তুমি
নিঃশব্দে শুনে গেছ।

কিন্তু বাস্তবের তুমি তো জানোনি।

জানোনি, একটি মানুষ তার যৌবনের
কতখানি আলো তোমার স্মৃতির কাছে রেখে দিয়েছিল;
জানোনি, তোমার অজান্তেই তুমি হয়ে উঠেছিলে
এক বিশাল হারিয়ে যাওয়া পাণ্ডুলিপির কেন্দ্র;
জানোনি, সেই কাগজগুলো একদিন হারিয়ে গেলেও
তাদের জন্ম দেওয়া অনুভূতিটি হারায়নি।

তারপর সময় আমাদের নিয়ে গেল
দুটি ভিন্ন জীবনের দিকে।
বছরের পরে বছর জমল,
মুখে বয়সের রেখা এলো,
পৃথিবী বদলাল-
আর যে কথাগুলো একদিন বলতে পারিনি,
সেগুলোও ধীরে ধীরে
না-বলার ইতিহাস হয়ে গেল।

আজও তাই তোমার কাছে কোনো অভিযোগ নেই-
তুমি জানোনি বলেই তো অপরাধী নও।

বরং কখনো কখনো মনে হয়,
না-জানাটাই হয়তো সুন্দর ছিল।

কারণ তুমি যদি সব জানতে,
হয়তো অস্বস্তিতে চোখ ফিরিয়ে নিতে;
আর আমি চাইনি আমার ভালোবাসা
তোমার এক মুহূর্তের অস্বস্তিরও কারণ হোক।

তাই এতকাল পরে
আমার সেই তরুণ বয়সটির কাছে ফিরে গিয়ে বলি-

লিখে যাও।
সব কথা তাকে জানাতে হয় না।
সব কবিতা তার হাতে পৌঁছাতেও হয় না।
কিছু কবিতা শুধু জন্ম নেয়
একজন মানুষকে নিঃশব্দে ভালোবেসেছিলে-
এই সাক্ষ্যটুকু রেখে যাওয়ার জন্য।

আর তুমি-তুমি জানোনি।
হয়তো আজও জানো না-
একটি জীবনের এতগুলো বছর পেরিয়েও
উনিশশো নব্বইয়ের কোনো এক বিকেলে
তোমাকে প্রথম দেখে থমকে যাওয়া
সেই তরুণটির কবিতা
এখনো শেষ হয়নি।

প্রথম গোপন পঙ্‌ক্তি

কবে প্রথম লিখেছিলাম তোমাকে নিয়ে-
তারিখটি আজ আর মনে নেই,
শুধু মনে আছে,
সেদিন রাত অনেক হয়েছিল;
চারপাশের পৃথিবী ঘুমিয়ে গেলে
আমার টেবিলে একটি সাদা কাগজ
কী আশ্চর্যভাবে জেগে ছিল।

কলম হাতে নিয়েছিলাম-
কী লিখব, জানতাম না।
কবিতা লিখব-এমন কোনো সিদ্ধান্তও ছিল না;
শুধু বুকের মধ্যে জমে থাকা
অচেনা এক অনুভূতি
কোনো একটি পথ খুঁজছিল বাইরে আসার।

তোমার নাম লিখতে গিয়েও লিখিনি।

মনে হয়েছিল,
নাম লিখে দিলে তুমি বুঝি
আমার একার গোপন পৃথিবী থেকে
হঠাৎ বাস্তবের মানুষ হয়ে যাবে।
তাই নামের জায়গাটি ফাঁকা রেখে
লিখেছিলাম শুধু-
“তুমি।”

সেই ‘তুমি’ যে কে,
পৃথিবীর কেউ জানত না;
কাগজ জানত,
কলম জানত,
আর জানত আমার অস্থির হৃদয়।

প্রথম পঙ্‌ক্তিটি কী ছিল-
আজ আর ঠিক মনে করতে পারি না।
এতগুলো বছর স্মৃতির ওপর দিয়ে
বয়ে গেছে সময়ের নদী;
কত শব্দ ভেসে গেছে,
কত বাক্য ডুবে গেছে বিস্মৃতির জলে।

তবু দুটি পঙ্‌ক্তি
কীভাবে যেন আজও ফিরে আসে-

“তোমায় দেবো নাকো তৃপ্তি বিভোর সুখের মেতে,
অন্তর আমার সইবে নাকো তোমার বেদনার চিৎকারে।”

হয়তো ঠিক সেই রাতেই লিখেছিলাম,
হয়তো আরও পরে;
স্মৃতি আজ তারিখের সাক্ষ্য দিতে পারে না।
কিন্তু আমি জানি,
এই কথার ভিতরেই কোথাও ছিল
আমার প্রথম প্রেমের সহজ দর্শন-

তোমাকে চাইব,
কিন্তু তোমার কষ্টের বিনিময়ে নয়।

তোমাকে ভালোবাসব,
কিন্তু আমার সুখের জন্য
তোমাকে কোনোদিন দুঃখ দেব না।

তখন কি বুঝেছিলাম
এই কথার ভার কত দীর্ঘ?

বুঝিনি।

তখন তো বয়স ছিল স্বপ্ন দেখার,
একটি মুখ দেখলেই
পৃথিবী বদলে যাওয়ার;
একটি হাসি মনে রেখে
সারারাত জেগে থাকার;
একটি নাম না লিখেও
শত পৃষ্ঠা ভরে ফেলার বয়স।

সেদিন প্রথম পঙ্‌ক্তির পরে
আরেকটি পঙ্‌ক্তি এলো,
তারপর আরেকটি।

শব্দেরা যেন আমাকে জিজ্ঞেস না করেই
নিজেদের জায়গা খুঁজে নিচ্ছিল কাগজে।

কখনো তোমার চোখ নিয়ে,
কখনো তোমার নীরবতা,
কখনো ক্যাম্পাসের পথে
তোমার হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য,
কখনো এমন কিছু নিয়েও লিখেছি
যা হয়তো কখনো ঘটেইনি-
শুধু ঘটেছিল আমার কল্পনায়।

রাত বাড়ত।

বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়ত,
দূরের কোনো শব্দও একসময় থেমে যেত;
শুধু আমার কলমটি থামতে চাইত না।

আমি লিখতাম।

কারও পড়ার জন্য নয়,
কোথাও প্রকাশের জন্য নয়,
তোমাকে দেওয়ার সাহসও ছিল না।

তবু লিখতাম।

কারণ তোমাকে না-বলা কথাগুলো
কাগজকে না বললে
বুকের ভেতর যেন জায়গা হতো না।

একদিন দেখি,
একটি কবিতা আর একটি কবিতায় থেমে নেই;
পাতা জমছে।

পাতার সঙ্গে রাত জমছে,
রাতের সঙ্গে তোমার স্মৃতি,
আর স্মৃতির সঙ্গে
এক তরুণ মানুষের অদ্ভুত এক জীবন।

সেই থেকেই হয়তো শুরু হয়েছিল
আমার সেই বিশাল গোপন পাণ্ডুলিপি।

কেউ জানত না তার কথা।

বন্ধুরা জানত না,
পরিবার জানত না,
এমনকি তুমি-
যার জন্য এত শব্দের জন্ম-
তুমিও জানোনি।

কী অদ্ভুত!

যাকে কেন্দ্র করে একটি বই লেখা হচ্ছে,
সে-ই জানে না
সে একটি বইয়ের প্রধান চরিত্র!

কখনো ভাবতাম,
একদিন হয়তো তোমাকে পড়তে দেব।

তুমি অবাক হয়ে বলবে-
“এত কিছু লিখেছ?”

আমি হয়তো লজ্জায় চোখ নামিয়ে বলব-
“সবটুকু তোমাকে নিয়ে নয়।”

অথচ আমরা দুজনেই জানব,
সেই কথাটি সত্য নয়।

কিন্তু সেই দিন আর আসেনি।

পাণ্ডুলিপি বড় হয়েছে,
আমরা বড় হয়েছি,
জীবন তার নিজের নিয়মে
আমাদের চারপাশ বদলে দিয়েছে।

একসময় সেই পাণ্ডুলিপিও হারিয়ে গেল।

কীভাবে হারাল,
কোন সময়ে,
কোন ঘরের কোন অন্ধকার কোণে
আমার যৌবনের সেই অক্ষরগুলো
শেষবারের মতো পড়ে ছিল-
আজ আর জানি না।

অনেক কিছু হারালে মানুষ আবার কিনতে পারে,
অনেক লেখা হারালে আবার লেখা যায়;
কিন্তু তরুণ বয়সে
প্রথম ভালোবাসার কাঁপা হাতে লেখা শব্দ-
তা কি দ্বিতীয়বার হুবহু ফিরে আসে?

আসে না।

কারণ সেই হাতটিও তো আর নেই।

আজকের হাতটি বয়সের,
অভিজ্ঞতার,
পাওয়া-হারানোর বহু ইতিহাসের।

সেদিনের হাতটি ছিল
শুধু বিস্ময়ের।

তবু আজ যখন আবার লিখতে বসেছি,
মনে হয়-
পাণ্ডুলিপিটি হয়তো পুরোপুরি হারায়নি।

তার কাগজ হারিয়েছে,
কালি হারিয়েছে,
বাক্য হারিয়েছে-

কিন্তু যে মানুষটির জন্য
প্রথম পঙ্‌ক্তিটি জন্মেছিল,
তার স্মৃতি তো এখনো
আমার ভেতরে কোথাও বসে আছে।

আর সবচেয়ে আশ্চর্য-

আজ প্রায় ষাটের কাছে এসে
কলম হাতে নিলে কখনো কখনো
আমার আঙুলের মধ্যে
সেই তরুণ বয়সের কাঁপনটুকু ফিরে আসে।

তখন মনে হয়,
সময় বুঝি বৃত্তের মতো।

আমি আবার সেই টেবিলে বসে আছি,
সামনে সাদা কাগজ,
বাইরে গভীর রাত,
আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে দেখা
একটি মুখ বারবার মনে পড়ছে।

পার্থক্য শুধু একটাই-

সেদিন জানতাম না
এই গল্প কোথায় যাবে।

আজ জানি
কত দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেছে সে।

তাই হারিয়ে যাওয়া পাণ্ডুলিপির জন্য
আজ আর আমার খুব বেশি দুঃখ হয় না।

হয়তো তার কাজই ছিল হারিয়ে যাওয়া-
যাতে এত বছর পরে
আমি আবার নতুন করে লিখতে পারি;
যাতে বৃদ্ধ হতে থাকা আমার হাতের পাশে
উনিশশো নব্বইয়ের সেই তরুণটি এসে বসে,
আর আস্তে করে বলে-

“কলমটা ধরো,
আমার কিছু কথা এখনো লেখা বাকি।”

আমি কলম ধরি।

সাদা পাতার দিকে তাকাই।

আর এত বছর পরেও
আমার প্রতিটি কবিতার প্রথম শব্দটি
কেমন করে যেন
সেই পুরোনো শব্দটিই হয়ে যায়-

তুমি।

তোমার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া

তোমার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া-
সে কি কেবল পথ পেরোনো ছিল?
তোমার কাছে হয়তো তাই,
আমার কাছে প্রতিবারই
একটি ছোট্ট জীবনের শুরু ও শেষ ছিল।

দূর থেকে তোমাকে দেখলেই
হঠাৎ বদলে যেত হাঁটার স্বাভাবিক ছন্দ;
যে পা এতক্ষণ নিজের নিয়মে চলছিল,
তোমার কাছাকাছি এলেই
সে যেন ভুলে যেত
কীভাবে সহজভাবে হাঁটতে হয়।

আমি তখন চোখ নামিয়ে নিতাম।

কেন নিতাম-
আজও তার ঠিক উত্তর জানি না।
ভয় ছিল তুমি চোখ তুলে তাকাবে?
নাকি আরও বড় ভয় ছিল-
তুমি তাকিয়েও
আমাকে দেখবে না?

দুটোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে
আমি বেছে নিতাম নীরবতা।

তোমার পাশ দিয়ে চলে যেতাম
এমন ভান করে,
যেন পৃথিবীতে তোমার চেয়ে
সাধারণ আর কিছু নেই।

অথচ বুকের ভেতর তখন
কী অসম্ভব কোলাহল!

মনে হতো-
তুমি কি শুনতে পাচ্ছ
আমার হৃদয়ের এই অবাধ্য শব্দ?

তুমি কি বুঝতে পারছ
একজন মানুষ তোমার কয়েক হাত দূর দিয়ে
কেবল হেঁটে যাচ্ছে না-
সে নিজের সমস্ত সাহস একত্র করে
একটি মুহূর্ত পার হচ্ছে?

তোমার ওড়নার প্রান্তে বাতাস লাগত,
চুলের পাশে আলো এসে পড়ত,
হাতে হয়তো বই থাকত-
অথবা বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে
তুমি অন্যমনস্কভাবে চলে যেতে।

কত সাধারণ ছিল সেই দৃশ্য!

আজ বুঝি,
জীবনের সবচেয়ে অসাধারণ স্মৃতিগুলো
প্রায়ই জন্ম নেয়
সবচেয়ে সাধারণ মুহূর্ত থেকে।

তোমার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়
আমি কখনো একটু ধীরে চলেছি,
কখনো অকারণে দ্রুত।

ধীরে চলেছি-
মুহূর্তটাকে আরেকটু দীর্ঘ করার জন্য।

দ্রুত চলেছি-
তুমি যেন আমার অস্থিরতা বুঝতে না পারো।

কী অদ্ভুত সেই বয়স!

একই হৃদয় একই সঙ্গে
কাছে যেতে চায়,
আবার নিজের গোপন কথাটি
প্রাণপণে লুকিয়ে রাখতে চায়।

কখনো আমাদের মাঝখানে
দূরত্ব ছিল মাত্র কয়েকটি হাতের;
তবু সেই কয়েক হাতই তখন
আমার কাছে পৃথিবীর দীর্ঘতম পথ।

ইচ্ছে করত বলি-

“শোনো…”

শুধু এই একটি শব্দ।

তারপর?

তারপর কী বলব
তা কোনোদিন ঠিক করতে পারিনি।

বলব-তোমাকে ভালো লাগে?

না, কথাটি বড় সামান্য মনে হতো।

বলব-তোমাকে দেখলে আমার দিন বদলে যায়?

সেটা বলার মতো সাহস ছিল না।

বলব-তোমাকে নিয়ে লিখি?

তাহলে তো আমার সমস্ত গোপন পৃথিবীর
দরজা খুলে যেত এক মুহূর্তে।

তাই কিছুই বলিনি।

তুমি চলে গেছ।

আর তোমার চলে যাওয়ার পরে
যে কথাগুলো মুখে আসেনি,
তারা সবাই একসঙ্গে ফিরে এসে
আমাকে ঘিরে ধরেছে।

আমি তখন মনে মনে বলেছি-

আরেকবার যদি দেখা হয়,
নিশ্চয়ই কথা বলব।

কিন্তু পরেরবারও
তোমার পাশ দিয়ে হেঁটে গেছি
ঠিক আগের মতোই নীরবে।

এভাবেই কত “পরেরবার”
একদিন অতীত হয়ে গেল!

কখনো কি আমাদের চোখ
এক মুহূর্তের জন্য মিলেছিল?

হয়তো মিলেছিল।

আজ এত বছর পরে
সেই ক্ষুদ্র মুহূর্তের সত্য-মিথ্যা
আলাদা করতে পারি না।

স্মৃতি বড় আশ্চর্য শিল্পী-
যেখানে রং ফিকে হয়ে যায়,
সেখানে সে নিজের মতো রং বসিয়ে দেয়।

তবু আমার মনে পড়ে,
কোনো একদিন তুমি সামনে থেকে আসছিলে,
আমি বিপরীত দিক দিয়ে।

দূরত্ব কমছিল।

দশ পা।

পাঁচ পা।

দুই পা।

তারপর-

তুমি আমার পাশ দিয়ে চলে গেলে।

মাত্র কয়েক সেকেন্ড।

কিন্তু আমি পেছনে ফিরে তাকাইনি।

ইচ্ছে ছিল।

ভীষণ ইচ্ছে ছিল।

তবু তাকাইনি।

কেননা তখন আমার তরুণ অহংকার বলেছিল-
ভালোবাসা প্রকাশ হয়ে গেলে
আমি বুঝি ছোট হয়ে যাব।

আজ এত বয়সে এসে
সেই ছেলেটিকে মনে মনে বলি-

বোকা ছেলে,
ভালোবাসলে কেউ ছোট হয় না।

তবে সব ভালোবাসা প্রকাশ করাও
সবসময় প্রয়োজন হয় না।

কিছু অনুভূতির সৌন্দর্য
তার সংযমের মধ্যেই থাকে।

হয়তো সেই সংযমই
একদিন আমাকে শিখিয়েছিল-
তোমার কাছে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার চেয়েও
তোমার স্বস্তি বড়।

তখন অবশ্য এত গভীর করে ভাবিনি।

তখন শুধু জানতাম-
তোমাকে দেখলে ভালো লাগে,
তোমার পাশ দিয়ে গেলে বুক কাঁপে,
আর তুমি চলে গেলে
পৃথিবীটা কয়েক মুহূর্তের জন্য
কেমন ফাঁকা হয়ে যায়।

আজ প্রায় একটি জীবন পরে
মানুষের ভিড়ের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে
কখনো হঠাৎ সেই অনুভূতিটা মনে পড়ে।

কত মানুষের পাশ দিয়েই তো
হেঁটে গেলাম সারাজীবন!

কত মুখ এল,
কত মুখ হারিয়ে গেল,
কত পরিচয় হলো,
কত নাম ভুলে গেলাম।

শুধু একজনের পাশ দিয়ে
হেঁটে যাওয়ার স্মৃতি
কেন এত বছর পরেও
মনের মধ্যে শব্দ তোলে?

হয়তো মানুষটিকে নয় শুধু-
আমি সেখানে আমার নিজের যৌবনকেও দেখি।

তোমার পাশ দিয়ে যে ছেলেটি হাঁটত,
সে তো আর পৃথিবীর কোথাও নেই।

তার মুখ বদলে গেছে,
তার চুলে সময় হাত রেখেছে,
তার চোখ পৃথিবীকে অনেক বেশি দেখেছে।

তবু তোমাকে মনে পড়লে
সে আবার ফিরে আসে।

ক্যাম্পাসের সেই পথ ধরে
দূর থেকে তোমাকে দেখে,
হঠাৎ হাঁটার গতি বদলায়,
চোখ নামিয়ে নেয়-

আর তোমার পাশ দিয়ে যাওয়ার ঠিক মুহূর্তে
তার বুকের মধ্যে আবার
প্রথম প্রেমের সেই পুরোনো শব্দটি বাজে।

আজ যদি কোনো অলৌকিক বিকেলে
আবার তোমার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে হয়,
আমি জানি না তুমি আমাকে চিনবে কি না।

হয়তো আমরা দুজনেই
চলে যাব দুই দিকে-
যেমন মানুষ প্রতিদিন
অসংখ্য অপরিচিত মানুষের পাশ দিয়ে চলে যায়।

আমি তোমাকে ডাকব না।

তোমার পথ থামাব না।

শুধু মনে মনে হয়তো বলব-

“দেখো,
ত্রিশ বছর তোমার সামনে আসিনি-
তোমার বলা দূরত্বটুকু রেখেছি যত্নে।
কিন্তু একটি কথা তুমি কোনোদিন নিষেধ করোনি-
তোমাকে মনে রাখা।”

তারপর আমিও চলে যাব।

আর কয়েক পা এগিয়ে
এবার হয়তো একবার পেছনে তাকাব-

তোমাকে দেখার জন্য নয়,

দেখব,
সেই পথের কোথাও
উনিশশো নব্বইয়ের সেই ছেলেটি
এখনো দাঁড়িয়ে আছে কি না।

যে প্রথম শিখেছিল-

কখনো কখনো কারও পাশ দিয়ে
নিঃশব্দে হেঁটে যাওয়াও
একটি সম্পূর্ণ প্রেমের কবিতা হতে পারে।

একটি বেঞ্চ, দুটি নীরবতা

ক্যাম্পাসের সেই বেঞ্চটির কথা
আজ হঠাৎ খুব মনে পড়ে-
গাছের ছায়ায় চুপচাপ পড়ে থাকা
সাধারণ একটি বেঞ্চ,
যার কোনো ইতিহাস ছিল না,
যতদিন না কোনো এক বিকেলে
তুমি এসে বসেছিলে তার ’পরে।

আমি ছিলাম কিছুটা দূরে।

কতটা দূরে-
আজ আর মাপতে পারি না।
দশ হাত, বিশ হাত,
নাকি তারও বেশি?

দূরত্ব তো সবসময়
হাত কিংবা পায়ে মাপা যায় না;
কখনো একজন মানুষ
চোখের সামনে থেকেও
এক পৃথিবী দূরে থাকে।

তুমি বসেছিলে আপন মনে।

হাতে হয়তো বই ছিল,
হয়তো ছিল খাতা,
হয়তো কিছুই ছিল না-
এত বছর পরে স্মৃতি
সবকিছুর হিসাব রাখেনি।

শুধু মনে রেখেছে-
তুমি ছিলে।

আর এটুকুই যেন
সেদিনের সমস্ত বিকেলের জন্য
যথেষ্ট ছিল।

তোমার পাশে জায়গা ছিল।

আমি চাইলে হয়তো
গিয়ে বসতে পারতাম।

কেউ নিষেধ করেনি,
কোনো দেয়াল ছিল না,
কোনো সীমানাও আঁকা ছিল না।

তবু যেতে পারিনি।

কেন?

আজকের আমি
সেই তরুণ আমাকে প্রশ্ন করি-
একটি বেঞ্চের অন্য প্রান্তে বসতে
কতটুকুই বা সাহস লাগে?

কিন্তু তখন জানতাম,
ওই কয়েক পা হাঁটা মানে
শুধু তোমার কাছে যাওয়া নয়-
আমার গোপন পৃথিবীটাকেও
তোমার চোখের সামনে নিয়ে যাওয়া।

তাই দাঁড়িয়ে ছিলাম দূরে।

তুমি নীরব।

আমিও নীরব।

কিন্তু আমাদের দুই নীরবতা
এক ছিল না।

তোমার নীরবতায় হয়তো
ছিল ক্লাসের ক্লান্তি,
কোনো পরীক্ষার চিন্তা,
বাড়ি ফেরার তাড়া,
বন্ধুর অপেক্ষা,
কিংবা একেবারেই কিছু না।

আর আমার নীরবতার মধ্যে?

সেখানে তখন
একটি সম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপির
শব্দেরা ভিড় করছিল।

তারা সবাই বলতে চাইছিল-

তোমাকে প্রথম দেখার পর
কেন ক্যাম্পাস বদলে গেছে,

কেন পরিচিত পথগুলো
অপরিচিত সুন্দর লাগে,

কেন ক্লাসের বই খুলে
অন্য অক্ষরের মাঝেও
তোমার মুখ মনে পড়ে,

কেন তোমাকে একদিন না দেখলে
দিনের কোথাও যেন
একটি অসম্পূর্ণতা থেকে যায়।

কত কথা!

অথচ মুখ খুলে
একটিও বলতে পারিনি।

ভাবছিলাম,
তুমি যদি হঠাৎ তাকাও?

ঠিক তখনই হয়তো
তুমি চোখ তুলেছিলে।

অথবা আমার স্মৃতিই
এত বছর পরে
সেই দৃশ্যটি তৈরি করেছে।

জানি না।

শুধু মনে হয়,
এক মুহূর্তের জন্য
তোমার চোখ এসেছিল আমার দিকে।

আমি সঙ্গে সঙ্গে
চোখ সরিয়ে নিয়েছিলাম।

যেন ধরা পড়ে গেছি!

কী ধরা পড়েছিল?

আমি তো কোনো অপরাধ করিনি।

শুধু একজন মানুষকে
ভালো লাগতে শুরু করেছিল।

তবু প্রথম প্রেমের কাছে
নিজের হৃদয়ই কখনো কখনো
সবচেয়ে বড় গোপন অপরাধের মতো লাগে।

আমি অন্যদিকে তাকিয়ে
এমন ভান করলাম,
যেন তোমাকে দেখিইনি।

অথচ পৃথিবীর মধ্যে
সেই মুহূর্তে
তোমাকেই সবচেয়ে বেশি দেখছিলাম।

কিছুক্ষণ পরে
তোমার পাশে কেউ এসে বসেছিল কি?

হয়তো কোনো সহপাঠী,
হয়তো কোনো বান্ধবী।

স্মৃতি সেখানে ঝাপসা।

শুধু এটুকু স্পষ্ট-
তোমার চারপাশে জীবন চলছিল
একেবারে স্বাভাবিক নিয়মে,
আর আমার ভেতরে
অস্বাভাবিক কিছু একটা
ধীরে ধীরে স্থায়ী হয়ে যাচ্ছিল।

আমি তখন বুঝিনি-
একদিন এই সামান্য বিকেলটিও
এত মূল্যবান হয়ে উঠবে।

মানুষ যখন তরুণ থাকে,
সে ভাবে বড় ঘটনাগুলোই
সারাজীবন মনে থাকবে।

পরে বুঝতে পারে-

জীবন আসলে থেকে যায়
ছোট ছোট দৃশ্যে।

একটি করিডোর,
একটি বিকেল,
একটি পরিচিত পথ,
কয়েকটি না-বলা কথা,

আর গাছের নিচে
একটি পুরোনো বেঞ্চ।

তুমি উঠে দাঁড়ালে।

আমি লক্ষ করলাম।

তুমি বই গুছিয়ে নিলে,
পোশাক ঠিক করলে,
তারপর ধীরে ধীরে
হেঁটে চলে গেলে।

বেঞ্চটি খালি হয়ে গেল।

অদ্ভুতভাবে মনে হলো,
কিছুক্ষণ আগে যে জায়গাটি
এত জীবন্ত ছিল,
তুমি চলে যেতেই
সেটি আবার কাঠ আর লোহার
একটি সাধারণ বস্তু হয়ে গেছে।

আমি আরও কিছুক্ষণ
সেখানেই ছিলাম।

তারপর কী মনে করে
বেঞ্চটির কাছে গেলাম।

তুমি যেখানে বসেছিলে
সেখানে বসিনি।

অন্য প্রান্তে বসেছিলাম।

আজ ভাবলে হাসি পায়-
তুমি তো তখন আর সেখানে নেই,
তবুও তোমার রেখে যাওয়া
অদৃশ্য জায়গাটুকুর প্রতিও
কী অদ্ভুত সংকোচ ছিল আমার!

আমি বসে রইলাম।

সন্ধ্যা নামছিল ধীরে।

পাখিরা ফিরছিল,
ক্যাম্পাসের কোলাহল কমছিল,
আর আমার মনে হচ্ছিল-
এইমাত্র ঘটে যাওয়া
সাধারণ কয়েকটি মিনিট
আমাকে কিছু একটা দিয়ে গেল।

সেদিন হয়তো প্রথম বুঝেছিলাম,
কাছে থাকা আর কাছে পাওয়া
এক কথা নয়।

একই বেঞ্চে বসার সুযোগ থাকলেও
দুটি মানুষের পৃথিবী
সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে।

আর ভালোবাসা?

সে কখনো কখনো
সেই আলাদা পৃথিবীর মাঝখানে
একটি অদৃশ্য সেতু বানায়-

যে সেতু দিয়ে
শুধু একজনই হাঁটে।

বহু বছর পরে
আমি যখন জীবনের
অনেক বেঞ্চে বসেছি-

রেলস্টেশনে,
পার্কে,
অচেনা শহরের পথে,
কোনো হাসপাতালের করিডোরে,
কোনো বিমানবন্দরের অপেক্ষায়-

কখনো হঠাৎ
সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বেঞ্চটির কথা
মনে পড়ে গেছে।

তখন বুঝেছি,
বেঞ্চটি আসলে বেঞ্চ ছিল না।

সেটি ছিল
আমার তরুণ বয়সের
একটি নীরব সাক্ষী।

সে দেখেছিল-
একজন মানুষ কত কাছে থেকেও
কাউকে স্পর্শ না করে,
ডেকে না থামিয়ে,
কোনো দাবি না জানিয়ে
শুধু উপস্থিতিটুকুতে আনন্দ পেতে পারে।

আজ জানি না
বেঞ্চটি আছে কি না।

হয়তো বহু আগেই
ভেঙে ফেলা হয়েছে।

হয়তো সেখানে
নতুন ভবন উঠেছে।

হয়তো নতুন কোনো বেঞ্চে
এখন অন্য দুই তরুণ-তরুণী বসে
নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলে।

কিন্তু আমার স্মৃতিতে
সেই বেঞ্চটি এখনো আছে।

সেখানে তুমি বসে আছো
উনিশশো নব্বইয়ের কোনো বিকেলে।

আর কিছুটা দূরে
আমি দাঁড়িয়ে আছি।

আমাদের মাঝখানে
কয়েক হাত পথ-

আর কয়েক দশকের ভবিষ্যৎ।

আজ যদি সেই বেঞ্চটি
আমাকে একটি প্রশ্ন করতে পারত-

“এত বছর পরেও
তুমি কেন সেই বিকেল মনে রেখেছ?”

আমি হয়তো বলতাম-

কারণ সেদিন
আমাদের মধ্যে কোনো প্রেমের কথা হয়নি,
কোনো প্রতিশ্রুতি হয়নি,
কোনো গল্পও শুরু হয়নি।

ছিল শুধু-

একটি বেঞ্চ,
দুটি মানুষ,
দুটি আলাদা পৃথিবী,
আর দুটি নীরবতা।

তোমার নীরবতা
হয়তো সেদিনই শেষ হয়ে গিয়েছিল।

আমার নীরবতাটি
আজও কবিতা হয়ে
লিখে চলেছে তোমাকে।

তোমার চোখের কাছে পরাজয়

তোমার চোখের কথা লিখতে গিয়ে
আজও আমার কলম থেমে যায়-
কী ছিল সেখানে,
কোন রঙ, কোন ভাষা, কোন অদৃশ্য টান,
এত বছর পরেও
তার সঠিক উপমা খুঁজে পাই না।

চোখ তো কতই দেখেছি জীবনে।

কত মানুষের চোখে আনন্দ,
কত চোখে অভিমান,
কত চোখে মায়া,
কত চোখে দেখেছি
জীবনের ক্লান্ত বিকেল।

তবু তোমার চোখের কাছে এসে
আমার সমস্ত উপমা
কেন যেন পরাজিত হয়ে যায়।

সেদিনও হয়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো এক সকালে
হঠাৎ আমাদের চোখ মিলেছিল-
মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য।

তুমি হয়তো তাকিয়েছিলে
একেবারেই স্বাভাবিকভাবে,
যেভাবে একজন মানুষ
আরেকজন মানুষের দিকে তাকায়।

কিন্তু আমার কাছে
সেই কয়েকটি মুহূর্ত
স্বাভাবিক ছিল না।

আমি প্রস্তুত ছিলাম না।

তোমাকে দূর থেকে দেখা সহজ ছিল,
তোমার পাশ দিয়ে
চোখ নামিয়ে চলে যাওয়া সহজ ছিল,
তোমার অনুপস্থিতিতে
তোমাকে নিয়ে শত পঙ্‌ক্তি লেখা
তারও চেয়ে সহজ।

কিন্তু-

তোমার চোখের দিকে
সরাসরি তাকানো?

সেটি আমার পক্ষে
কখনোই সহজ ছিল না।

কারণ তোমার চোখে তাকালেই
আমার মনে হতো,
আমি বুঝি আর কিছুই
লুকিয়ে রাখতে পারব না।

আমার সমস্ত গোপন কবিতা,
সমস্ত অপেক্ষা,
ক্যাম্পাসে অকারণে ঘুরে বেড়ানো,
তোমাকে একবার দেখার জন্য
একটু বেশি সময় থেকে যাওয়া-

সব তুমি বুঝে ফেলবে।

তাই চোখ সরিয়ে নিতাম।

তুমি কি কখনো ভেবেছিলে,
আমি কেন এমন করি?

হয়তো ভাবোনি।

হয়তো আমার এই সামান্য অস্থিরতা
তোমার চোখেই পড়েনি।

তোমার জীবনে তখন
কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল-
পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ, পরিবার, বন্ধু,
নিজের কত স্বপ্ন।

সেখানে আমার চোখ নামিয়ে নেওয়া
কোনো ঘটনা হওয়ার কথাও নয়।

অথচ আমার কাছে
তা ছিল একেকটি ইতিহাস।

একদিন মনে আছে-
তুমি সামনে দাঁড়িয়ে ছিলে।

চারদিকে মানুষ ছিল,
কথা হচ্ছিল,
হাসির শব্দ ছিল,
কেউ আসছিল, কেউ যাচ্ছিল।

সেই কোলাহলের মধ্যে
হঠাৎ তুমি তাকালে।

আমি তাকিয়েছিলাম।

কয়েক মুহূর্তের জন্য
পৃথিবী থেকে যেন
সব শব্দ সরে গেল।

আমি জানি,
এটি হয়তো শুধু আমার অনুভব।

তোমার কাছে সেই মুহূর্তটি
কোনো স্মৃতিই নয়।

কিন্তু প্রেমের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য
হয়তো এখানেই-

যে মুহূর্ত একজনের জীবনে
কিছুই নয়,
সেই একই মুহূর্ত
অন্যজন সারাজীবন বহন করতে পারে।

তোমার চোখে তখন
আমি কী দেখেছিলাম?

প্রেম?

না।

আজ এত বছর পরে
আমি সেই দাবি করতে চাই না।

মায়া?

তাও হয়তো নয়।

আমি শুধু দেখেছিলাম
তোমাকে।

একজন স্বাধীন মানুষকে,
যার নিজের একটি পৃথিবী আছে;
যে আমার কল্পনার চরিত্র নয়,
আমার কবিতার জন্য জন্মায়নি,
আমার ভালোবাসার উত্তর দেওয়ার
কোনো দায়ও যার নেই।

এই উপলব্ধিটি তখন ছিল না।

তখন তোমার চোখ
শুধু আমাকে অস্থির করত।

আজ সেই চোখের স্মৃতি
আমাকে অন্য কিছু শেখায়।

শেখায়-

ভালোবাসা মানে
কারও চোখের ভাষাকে
নিজের ইচ্ছেমতো অনুবাদ করা নয়।

একটি হাসিকে সম্মতি,
একটি তাকানোকে আহ্বান,
একটি সৌজন্যকে ভালোবাসা
ভেবে নেওয়ার নাম প্রেম নয়।

তখনকার আমি
এত কিছু বুঝতাম না।

সে শুধু জানত-
তুমি তাকালে তার বুক কাঁপে।

তাই সে কবিতা লিখত।

কখনো লিখত তোমার চোখে আকাশ আছে,
কখনো নদী,
কখনো গভীর রাত,
কখনো অজানা কোনো সমুদ্র।

আজ সেই পুরোনো উপমাগুলো
মনে করার চেষ্টা করলে
নিজের ওপরই মায়া হয়।

কী সরল ছিল সেই ছেলেটি!

সে জানত না-
চোখকে আকাশ বলার প্রয়োজন নেই।

কোনো কোনো চোখ
শুধু চোখ হয়েই
একটি মানুষের জীবনে
যথেষ্ট গভীর হয়ে থাকে।

তোমার চোখও তাই।

আমি তার রঙের কথা
আজ আর নিখুঁতভাবে বলতে পারব না।

সময়ের সঙ্গে
অনেক দৃশ্য ঝাপসা হয়েছে।

কিন্তু অদ্ভুতভাবে মনে আছে
তোমার তাকানোর পর
আমার চোখ নামিয়ে নেওয়ার অনুভূতি।

যেন আমি হেরে গেলাম।

কিন্তু কিসের যুদ্ধে?

তোমার সঙ্গে তো
আমার কোনো যুদ্ধ ছিল না।

যুদ্ধ ছিল নিজের সঙ্গে।

একদিকে ইচ্ছে-
আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকি।

অন্যদিকে ভয়-
আমার চোখই যদি বলে দেয়
যে কথা মুখে বলিনি?

শেষ পর্যন্ত
প্রতিবারই ভয় জিতেছে।

আর আমি ভেবেছি
তোমার চোখের কাছে হেরে গেলাম।

আজ বুঝি-

সেটি পরাজয় ছিল না।

সেটি ছিল
একজন তরুণ মানুষের প্রথম শিক্ষা-
কিছু অনুভূতি এত গভীর হয়
যে ভাষার আগে চোখই
তাদের প্রকাশ করে ফেলে।

তারপর একদিন
আমাদের জীবনে এমন সময় এলো
যখন তোমার চোখের দিকে তাকানোর
সুযোগও আর রইল না।

আমি দূরে সরে গেলাম।

দিন গেল।

বছর গেল।

এক দশক,
দুই দশক,
প্রায় তিন দশক।

এই দীর্ঘ সময়ে
তোমার চোখ সামনে থেকে দেখিনি।

কিন্তু স্মৃতি বড় অদ্ভুত।

যে চোখকে এত বছর দেখা হয়নি,
কখনো কোনো নির্জন রাতে
সেই চোখই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আমি তখন ভাবি-

সময় কি তোমার চোখকেও বদলেছে?

সেখানে কি এখন
জীবনের দীর্ঘ পথের ক্লান্তি জমেছে?

নাকি এখনো হাসলে
চোখের কোণে সেই পরিচিত আলো
একইভাবে এসে বসে?

তার উত্তর জানার চেষ্টা করি না।

কারণ সব প্রশ্নের উত্তর
জানতেই হবে-এমন তো নয়।

কিছু প্রশ্ন
উত্তরহীন থাকলেই
স্মৃতির সঙ্গে মানায়।

শুধু মাঝে মাঝে
উনিশশো নব্বইয়ের সেই তরুণটির কথা মনে পড়ে।

আমি তাকে দেখি-
ক্যাম্পাসের ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছে,
সামনে তুমি।

হঠাৎ তোমাদের চোখ মিলেছে।

ছেলেটি অস্থির হয়ে
চোখ নামিয়ে নিয়েছে।

আমি আজকের বয়স থেকে
তার কাঁধে হাত রেখে বলতে চাই-

“চোখ নামিয়ে নিয়েছ বলে
মন খারাপ করো না।

একদিন তুমি বুঝবে,
সব পরাজয়ে মানুষ কিছু হারায় না।

কিছু পরাজয়
সারাজীবনের জন্য
একটি সুন্দর স্মৃতি দিয়ে যায়।”

আর যদি সে আমাকে জিজ্ঞেস করে-

“এত বছর পরে
আমি কি কখনো জিতেছিলাম?”

আমি বলব-

“ভালোবাসায় জেতা-হারার
কোনো হিসাব নেই।

তুমি তাকে পাওনি,
তাকে নিজের বলোনি,
এমনকি দীর্ঘ বছর
তার সামনে গিয়েও দাঁড়াওনি।

তবু যে মুহূর্তে
তার ইচ্ছাকে নিজের ইচ্ছার চেয়ে বড় করে দেখেছ,
সেদিনই তোমার ভালোবাসা
তোমার আকাঙ্ক্ষাকে অতিক্রম করেছে।”

তাই আজ আর বলি না-
আমি তোমার চোখের কাছে হেরে গিয়েছিলাম।

বরং বলি-

তোমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে
আমার অহংকার হেরেছিল,
আমার ভাষা হেরেছিল,
আমার সমস্ত প্রস্তুত বাক্য হেরেছিল।

শুধু একটি জিনিস
পরাজয় মানেনি-

তোমাকে দেখে জন্ম নেওয়া
সেই প্রথম কবিতার বিস্ময়।

আজও যখন চোখ বন্ধ করি,
কখনো সেই ক্যাম্পাস ফিরে আসে।

মানুষের ভিড়ের মধ্যে তুমি দাঁড়িয়ে।

আমি দূরে।

হঠাৎ তুমি তাকাও।

আর প্রায় ষাটের কাছে দাঁড়ানো
আজকের এই মানুষটির ভেতর থেকে
উনিশশো নব্বইয়ের সেই ছেলেটি
আবার চোখ নামিয়ে নেয়।

তারপর খুব আস্তে বলে-

“তোমার চোখের কাছে
আমি সেদিনও পরাজিত ছিলাম,
আজও আছি-
শুধু আজ জানি,
এই পরাজয় থেকে মুক্তি
আমি কোনোদিন চাইনি।”

ক্লাস শেষে তুমি

ক্লাস শেষ হওয়ার ঘণ্টাটি
সবার কাছে ছিল ছুটির সংবাদ,
আমার কাছে তার অর্থ ছিল অন্য-
দরজা খুলবে,
করিডোর ভরে উঠবে মানুষের শব্দে,
আর সেই ভিড়ের কোনো এক প্রান্তে
হয়তো দেখা যাবে তোমাকে।

তাই ক্লাস শেষ হলেও
আমার তাড়া থাকত না।

বন্ধুরা বলত-
চলো।

আমি বলতাম-
তোমরা যাও, একটু পরে আসছি।

কী কাজ ছিল আমার?

কিছুই না।

বই গুছাতে অকারণ সময় নিতাম,
কলমটি ব্যাগে রেখেও
আবার বের করতাম,
কোনো প্রয়োজনহীন পাতায়
চোখ রেখে অপেক্ষা করতাম-

শুধু তোমার ক্লাসটি
কখন শেষ হবে।

কখনো তোমার কক্ষের সামনে নয়,
কখনো তোমার পথ আটকে নয়-
নিজের মতো কোনো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে
আমি শুধু চাইতাম
একটি আকস্মিক দেখা।

যেন সবটাই কাকতালীয়।

যেন আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করিনি।

যেন তোমাকে দেখার সঙ্গে
আমার বিকেলের কোনো সম্পর্কই নেই।

অথচ তখন আমার সমস্ত বিকেল
তোমার একটি মুহূর্তের কাছে
কী সহজে পরাজিত হয়ে থাকত!

তারপর-

কোনো এক দরজা দিয়ে
তুমি বেরিয়ে আসতে।

সঙ্গে কয়েকজন সহপাঠী,
হাতে বই-খাতা,
চোখেমুখে সদ্য শেষ হওয়া ক্লাসের
সাধারণ ব্যস্ততা।

তুমি হয়তো কোনো কথায় হাসছ,
কখনো মন দিয়ে কারও কথা শুনছ,
কখনো দ্রুত পায়ে হাঁটছ-

আর আমি দূর থেকে ভাবছি,

মানুষের হাঁটাও
এত সুন্দর হতে পারে?

তখন জানতাম না
সৌন্দর্য আসলে তোমার হাঁটায় ছিল,
নাকি আমার দেখার চোখে।

প্রেমে পড়া মানুষের চোখ
বোধহয় পৃথিবীকে নিরপেক্ষভাবে দেখে না।

সে যাকে ভালোবাসে,
তার অতি সাধারণ কাজেও
একটু বেশি আলো বসিয়ে দেয়।

তুমি বই হাতে নিলে-
সেটিও সুন্দর।

তুমি চুল সরালে-
সেটিও মনে থাকে।

তুমি কারও প্রশ্নের উত্তর দিলে-
দূর থেকে শব্দ না শুনেও
আমি দৃশ্যটি মনে রাখি।

তুমি চলে গেলে-

সেই চলে যাওয়াটুকুও
আমার কাছে কবিতা।

কখনো তোমাকে দেখে
আমি অন্য পথে চলে যেতাম।

কেন?

হয়তো ভয় ছিল
একই পথে গেলে তুমি ভাববে
আমি তোমাকে অনুসরণ করছি।

আমি চাইনি
আমার ভালো লাগা
তোমার চলার পথে কোনো অস্বস্তি হয়ে দাঁড়াক।

তাই মন চাইত একদিকে,
পা যেত অন্যদিকে।

আজ ভাবি-
প্রেমের প্রথম পাঠগুলোর একটি
আমি হয়তো তখনই শিখছিলাম:

কাছে যাওয়ার সুযোগ থাকলেই
কাছে যেতে হয় না।

কখনো দূরত্বও
ভালোবাসার একটি ভদ্র ভাষা।

তবে সবদিন এত সংযমী ছিলাম না।

কখনো তোমার পেছনে নয়,
কিন্তু একই পথের অনেক দূরে
হেঁটেছি কিছুটা বেশি সময়-

শুধু এই আশায়,
হয়তো আর একবার
তুমি পেছন ফিরে তাকাবে।

তুমি তাকাওনি।

আজ ভালোই হয়েছে মনে হয়।

কারণ তুমি যদি তাকাতে,
আমি কী করতাম?

হয়তো সঙ্গে সঙ্গে
অন্যদিকে তাকিয়ে
আকাশ দেখার ভান করতাম!

সেই বয়সের ভালোবাসা
কী মধুরভাবে নির্বোধ ছিল!

একদিকে একটি মানুষকে
দেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা,
অন্যদিকে মানুষটি তাকালেই
চোখ লুকিয়ে ফেলা।

কাছে যেতে চাওয়া,
আবার কাছে এলে পালানো।

কথা বলার জন্য
সারারাত বাক্য সাজানো,
সামনে পড়লে
একটি শব্দও মনে না থাকা।

তুমি এসব কিছুই জানতে না।

তোমার ক্লাস শেষ হতো,
তুমি বেরিয়ে আসতে,
নিজের জীবনের দিকে হেঁটে যেতে।

আর আমার ক্লাস?

আমার আরেকটি ক্লাস
তখনই শুরু হতো।

তার কোনো শিক্ষক ছিল না,
কোনো পাঠ্যবই ছিল না,
পরীক্ষাও ছিল না।

সেখানে আমি শিখছিলাম-

অপেক্ষা কী,

অস্থিরতা কী,

একটি মুখের উপস্থিতিতে
কীভাবে সময় দ্রুত চলে যায়,

আর তার অনুপস্থিতিতে
এক মিনিটও কীভাবে
অকারণে দীর্ঘ হয়ে ওঠে।

কোনো কোনো দিন
তোমার ক্লাস শেষ হয়েছে,
কিন্তু তুমি বের হওনি।

অথবা হয়তো অন্য পথ দিয়ে চলে গেছ।

আমি অপেক্ষা করেছি।

পাঁচ মিনিট।

দশ মিনিট।

আরও কিছুক্ষণ।

তারপর ধীরে ধীরে
করিডোর ফাঁকা হয়ে গেছে।

মানুষ কমেছে।

শব্দ কমেছে।

শেষ পর্যন্ত বুঝেছি-
আজ আর দেখা হবে না।

কী অদ্ভুত এক শূন্যতা
তখন বুকের মধ্যে নামত!

যেন কেউ আমাকে
কিছু দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল,
তারপর দেয়নি।

অথচ কেউ তো
কোনো প্রতিশ্রুতিই দেয়নি।

তুমি তো বলোনি-
“ক্লাস শেষে আমাকে দেখতে পাবে।”

আমিই নিজের মনে
একটি প্রত্যাশা বানিয়েছিলাম।

আমিই তার জন্য অপেক্ষা করেছি।

আমিই শেষে
সামান্য মন খারাপ নিয়ে বাড়ি ফিরেছি।

আজ বুঝি-

মানুষের অনেক কষ্টই
অন্য মানুষ তৈরি করে না;
আমাদের নিজের প্রত্যাশা
নিঃশব্দে তৈরি করে।

কিন্তু তখন
এত দর্শন জানতাম না।

তখন শুধু মনে হতো-

আজ তোমাকে দেখা হলো না।

দিনটি যেন
একটু অসম্পূর্ণ থেকে গেল।

আর যেদিন দেখা হতো?

সেদিন বাড়ি ফেরার পথটাও
অন্যরকম লাগত।

বাসের জানালা দিয়ে
চেনা শহরকে নতুন মনে হতো,
রাস্তার আলো একটু বেশি উজ্জ্বল,
বাতাস একটু বেশি কোমল।

বাড়ি ফিরে বই খুলতাম।

কিন্তু পড়ার আগে
সাদা কাগজটি টেনে নিতাম কাছে।

কারণ ক্লাস শেষে
তোমার কয়েক মিনিটের উপস্থিতি
ততক্ষণে আমার ভেতরে
কয়েকটি নতুন পঙ্‌ক্তি হয়ে গেছে।

আমি লিখতাম-

তোমার হেঁটে যাওয়া,
তোমার হাসি,
তোমার হাতে বই,
তোমার চোখের কোনো ক্ষণিক দৃষ্টি।

কখনো সত্য লিখতাম।

কখনো সত্যের সঙ্গে
কল্পনা মিশিয়ে দিতাম।

কবির তো এইটুকু স্বাধীনতা ছিল!

বাস্তবে তুমি
হয়তো একবারও আমার দিকে তাকাওনি,

কিন্তু কবিতায়
কখনো তোমাকে দিয়ে
একবার পেছন ফিরে তাকিয়েছি।

বাস্তবে আমাদের
কথা হয়নি,

কিন্তু কবিতায়
তোমার সঙ্গে কত সন্ধ্যা
কথা বলে কাটিয়েছি।

বাস্তব আমাকে
যেটুকু দেয়নি,

কল্পনা তার চেয়ে বেশি দিয়েছিল।

তবু একটি সীমা ছিল-

আমার কল্পনার তোমাকে
আমি কখনো বন্দী করতে চাইনি।

কারণ অদ্ভুতভাবে
তরুণ বয়সেই আমার মনে হয়েছিল-

যাকে ভালোবাসি,
তার স্বাধীনতাও ভালোবাসতে হয়।

তার হাসি যদি
আমাকে ছাড়া পূর্ণ হয়,

তবু সেই হাসি সুন্দর।

তার পথ যদি
আমার পথ থেকে আলাদা হয়,

তবু তার পথ থামিয়ে
আমার দিকে ফেরানো
ভালোবাসা হতে পারে না।

এই উপলব্ধি তখন
সম্পূর্ণ ছিল না হয়তো।

পরে জীবন তাকে
অনেক কঠিনভাবে পূর্ণ করেছে।

একদিন সত্যিই
আমাকে তোমার পথ থেকে
সরে দাঁড়াতে হয়েছে।

আর আমি সরে গেছি।

তারপর কত হাজার ক্লাস
শেষ হয়েছে পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে।

কত তরুণ দরজা দিয়ে বেরিয়েছে,
কত প্রেম শুরু হয়েছে,
কত প্রেম শেষ হয়েছে।

আমাদের বয়সও
চুপচাপ এগিয়েছে ষাটের দিকে।

আজ আর কোনো করিডোরে দাঁড়িয়ে
তোমার ক্লাস শেষ হওয়ার
অপেক্ষা করি না।

প্রায় ত্রিশ বছর
সামনে থেকে তোমাকে দেখতেও যাইনি।

তবু কখনো
বিকেলের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস দেখলে
আমার ভেতরে অদ্ভুতভাবে
একটি পুরোনো ঘণ্টা বেজে ওঠে।

মনে হয়-

এই তো ক্লাস শেষ হলো।

এখনই হয়তো
দরজা দিয়ে তুমি বেরিয়ে আসবে।

হাতে কয়েকটি বই থাকবে,
পাশে সহপাঠীরা,
তুমি নিজের মতো হেঁটে যাবে।

আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকবে
একজন তরুণ-

যে তখনো জানে না
এই কয়েক মিনিটের অপেক্ষা
একদিন তিন দশকের স্মৃতি হয়ে যাবে।

আমি আজ তার পাশে গিয়ে
নিঃশব্দে দাঁড়াই।

তাকে বলি না
ভবিষ্যতে কী ঘটবে।

বললে হয়তো
তার এই নির্মল অপেক্ষাটুকু
বিষণ্ন হয়ে যাবে।

শুধু কাঁধে হাত রেখে বলি-

“দেখে নাও।
কোনো দাবি নিয়ে নয়,
কোনো ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নিয়ে নয়-
শুধু এই মুহূর্তটুকু দেখে রাখো।

একদিন অনেক বয়সে
তোমার সব ক্লাস শেষ হয়ে যাবে,
অনেক বই বন্ধ হয়ে যাবে,
অনেক মুখও ভুলে যাবে-

কিন্তু ক্লাস শেষে
মানুষের ভিড়ের মধ্যে
ওই মেয়েটির হেঁটে আসার দৃশ্যটি
তোমার হৃদয়ের কোনো এক করিডোরে
আজীবন ক্লাস শেষে বেরিয়ে আসবে।”

যেদিন অপেক্ষার জন্ম হলো

অপেক্ষা যে একদিন জন্ম নেয়-
আগে তা জানতাম না।
ভাবতাম, মানুষ শুধু মানুষের জন্য অপেক্ষা করে,
কোনো কাজের জন্য,
কোনো খবরের জন্য,
কোনো ফিরে আসার জন্য।

কিন্তু তোমাকে দেখার পর বুঝলাম-
কখনো কখনো অপেক্ষার কোনো প্রতিশ্রুতি থাকে না,
কোনো নির্দিষ্ট সময় থাকে না,
এমনকি যার জন্য অপেক্ষা-
সে জানেও না
কেউ তার জন্য অপেক্ষা করছে।

সেদিন সকাল থেকেই
মনটা কেমন অস্থির ছিল।

কেন ছিল-
নিজেকেও বলতে পারিনি।

ক্লাসে শিক্ষক পড়াচ্ছিলেন,
বোর্ডে একের পর এক শব্দ উঠছিল,
সহপাঠীরা লিখছিল মন দিয়ে;
আমিও খাতা খুলে বসেছিলাম-

কিন্তু আমার মন
ক্লাসরুমের জানালা পেরিয়ে
কখন যে চলে গিয়েছিল
সেই পরিচিত পথটির কাছে।

মনে হচ্ছিল-

আজ কি তোমাকে দেখব?

এই একটি প্রশ্ন
কীভাবে যে সমস্ত পড়াশোনার মাঝখানে
নিজের জন্য জায়গা করে নিয়েছিল!

তখনও আমাদের মধ্যে
কোনো কথা ছিল না,
কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না,
তুমি বলোনি-
“অপেক্ষা করো, আমি আসব।”

তবু আমি অপেক্ষা করেছিলাম।

ক্লাস শেষ হলো।

সবাই বেরিয়ে গেল।

আমি একটু ধীরে বই গুছালাম,
যেমন ইদানীং প্রায়ই করি।

বাইরে এসে দাঁড়ালাম
এমন একটি জায়গায়
যেখান থেকে কয়েকটি পথ দেখা যায়।

নিজেকে বোঝালাম-

আমি কারও জন্য দাঁড়াইনি।

একটু পরে চলে যাব।

কিন্তু এক মিনিট গেল।

তারপর আরেক মিনিট।

মানুষ আসছে,
মানুষ যাচ্ছে।

প্রতিটি দূরের অবয়ব দেখে
মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছে-

তুমি?

না।

অন্য কেউ।

আবার কেউ আসছে।

আবার বুকের ভেতর
ক্ষুদ্র একটি প্রত্যাশা।

আবার ভুল।

সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম,
অপেক্ষা আসলে ঘড়ির কাঁটায় চলে না-
চলে আশায়।

যতক্ষণ আশা থাকে,
ততক্ষণ পাঁচ মিনিটও দীর্ঘ হয় না।

আর যখন আশা নিভে যায়,
এক মুহূর্তেই মানুষ বুঝে ফেলে-
অনেকক্ষণ হয়ে গেছে।

তুমি এলে না।

হয়তো সেদিন
তোমার ক্লাসই ছিল না।

হয়তো অন্য কোনো পথ দিয়ে
চলে গিয়েছিলে।

হয়তো তুমি ক্যাম্পাসেই আসোনি।

কত সহজ কারণই তো হতে পারে!

কিন্তু আমি তখন
কোনোটাই জানতাম না।

জানার অধিকারও ছিল না।

শুধু দাঁড়িয়ে ছিলাম।

একসময় চারপাশের ভিড় কমে এলো।

যে পথের দিকে তাকিয়ে ছিলাম
সেটিও ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে গেল।

বিকেলের আলো
গাছের ছায়ায় দীর্ঘ হলো।

আমি বুঝলাম-

আজ আর তোমাকে দেখা হবে না।

কী আশ্চর্য!

একজন মানুষকে
মাত্র কয়েকদিন আগে চিনেছি,
ঠিকমতো চিনিও না-
তবু তাকে একদিন না দেখে
কেন মনে হচ্ছে
দিনের কোথাও কিছু একটা বাদ পড়ে গেছে?

সেদিন উত্তর পাইনি।

আজ পাই।

সেদিনই অপেক্ষার জন্ম হয়েছিল।

পরদিন আবার গেলাম।

এবার নিজেকে বললাম-

আজ অপেক্ষা করব না।

ক্লাস শেষ করেই চলে যাব।

কিন্তু মানুষ নিজের হৃদয়ের কাছে
কত সহজেই যে মিথ্যা বলে!

আমি আবার সেই পথের কাছে গেলাম।

আবার দাঁড়ালাম।

আবার দূরের মুখগুলোর মধ্যে
একটি মুখ খুঁজলাম।

এবং-

সেদিন তুমি এলে।

হয়তো খুব সাধারণভাবেই।

তুমি জানতেই পারলে না
তোমার আসার মধ্যে
কারও জন্য এত বড় একটি ঘটনা লুকিয়ে ছিল।

তুমি হেঁটে আসছিলে।

আমার মনে হলো,
কালকের অসম্পূর্ণ বিকেলটি
আজ এসে পূর্ণ হলো।

কী বলেছিলাম তোমাকে?

কিছুই না।

হয়তো তুমি আমাকে দেখেছ,
হয়তো দেখোনি।

কিন্তু তোমাকে দেখার পর
আমি আর দাঁড়িয়ে থাকিনি।

চলে এসেছিলাম।

কারণ অপেক্ষার প্রয়োজন
সেদিনের মতো শেষ হয়ে গিয়েছিল।

এভাবেই শুরু।

তারপর অপেক্ষা
আমার জীবনের ছোট ছোট জায়গা দখল করতে লাগল।

ক্লাসের আগে-

হয়তো তোমাকে দেখব।

ক্লাসের পরে-

হয়তো তুমি বের হবে।

লাইব্রেরির পথে-

হয়তো দেখা হবে।

ক্যাম্পাসের কোনো অনুষ্ঠানে-

হয়তো তুমি থাকবে।

একটি “হয়তো”
কীভাবে যে এতগুলো দিনের সঙ্গে
জড়িয়ে গেল!

কখনো অপেক্ষা সফল হয়েছে।

কখনো হয়নি।

যেদিন তোমাকে দেখেছি,
মনে হয়েছে-

এই তো,
এতটুকুর জন্যই তো দাঁড়িয়ে ছিলাম।

আর যেদিন দেখিনি,
নিজেকে বলেছি-

কাল দেখা যাবে।

‘কাল’-
প্রেমে পড়া মানুষের কাছে
কী আশ্চর্য একটি শব্দ!

আজ না-পাওয়ার কষ্টটুকুকে
সে একটি ছোট্ট আশ্বাস দেয়-

কাল।

তখন জানতাম না
এই ছোট ছোট অপেক্ষাগুলো
একদিন আমাকে
বড় অপেক্ষার জন্য তৈরি করছে।

জানতাম না
একসময় এমন দিন আসবে
যখন তোমার জন্য অপেক্ষা মানে
ক্যাম্পাসের কোনো পথে দাঁড়িয়ে থাকা নয়।

বরং-

দূরে থাকা।

না-দেখা।

না-ডাকা।

নিজেকে থামিয়ে রাখা।

তুমি যখন আমাকে
তোমার কাছ থেকে দূরে থাকতে বললে,
আমি প্রথমবার বুঝলাম-

অপেক্ষারও বয়স বাড়ে।

তরুণ বয়সের অপেক্ষা বলে-

“কখন আসবে?”

পরিণত বয়সের অপেক্ষা বলে-

“না এলেও ভালো থেকো।”

এই দুই বাক্যের মাঝখানে
একটি মানুষের প্রায় পুরো জীবন
পেরিয়ে যেতে পারে।

প্রথম দিকে হয়তো মনে হয়েছিল,
সময় সবকিছু মুছে দেবে।

এক বছর।

দুই বছর।

পাঁচ বছর।

দশ বছর।

মানুষ তো বদলায়।

স্মৃতি ফিকে হয়।

জীবন নতুন দায়িত্বে ভরে যায়।

আমি ভেবেছিলাম-
একদিন হয়তো সকালে উঠে দেখব
তোমাকে আর মনে পড়ছে না।

সেই দিনটি আসেনি।

তার মানে এই নয়
প্রতিদিন তোমার কথা ভেবে বসে থেকেছি।

জীবন থেমে থাকেনি।

মানুষের জীবন
কোনো একটি স্মৃতির কাছে
সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে থাকতে পারে না।

কাজ এসেছে,
দায়িত্ব এসেছে,
সাফল্য এসেছে,
ব্যর্থতা এসেছে,
নতুন নতুন মানুষ এসেছে জীবনে।

আমি হেসেছি।

ব্যস্ত থেকেছি।

পৃথিবীর কত পথ পেরিয়েছি।

তবু কখনো কোনো নির্জন মুহূর্তে
কোনো কারণ ছাড়াই
উনিশশো নব্বইয়ের একটি বিকেল
দরজা খুলে ঢুকে পড়েছে মনে।

আর তার সঙ্গে-

তুমি।

তখন বুঝেছি,
অপেক্ষা সবসময় কারও ফিরে আসার জন্য নয়।

কিছু অপেক্ষা
কোনো ঘটনার জন্যও নয়।

তারা শুধু থেকে যায়
স্মৃতির পাশে বসে।

কিছু চায় না।

দরজায় শব্দ হলেই ছুটে যায় না।

কোনো ফোনের অপেক্ষায় থাকে না।

কোনো চিঠিরও নয়।

শুধু মানুষের ভেতরে
একটি ছোট আলো জ্বালিয়ে রাখে-

যে আলো বলে,

একদিন
তুমি কাউকে খুব গভীরভাবে
ভালোবাসতে পেরেছিলে।

আজ আমাদের বয়স
ষাটের কাছাকাছি।

এখন ‘অপেক্ষা’ শব্দটির অর্থ
আমার কাছে সম্পূর্ণ অন্যরকম।

আজ আর অপেক্ষা করি না
তুমি কোনো পথ দিয়ে আসবে বলে।

অপেক্ষা করি না
তুমি কোনোদিন ফিরে তাকাবে বলে।

অপেক্ষা করি না
আমার হারিয়ে যাওয়া পাণ্ডুলিপির
কোনো উত্তর পাওয়ার জন্য।

এমনকি এই কবিতাগুলোও
তোমার কাছে পৌঁছাবে-
সেই প্রত্যাশাও এদের জন্মের শর্ত নয়।

কারণ এত বছরে
একটি কথা শিখেছি-

যে ভালোবাসার সঙ্গে দাবি নেই,
তার অপেক্ষারও কোনো পাওনা থাকে না।

তবু যদি আমাকে প্রশ্ন করো-

তাহলে এত বছর ধরে
কীসের অপেক্ষা?

আমি হয়তো উত্তর দিতে পারব না।

হয়তো বলব-

কোনো কিছুরই নয়।

আবার হয়তো বলব-

একটি মুহূর্তের।

সেই মুহূর্ত
যা ইতিমধ্যে ঘটে গেছে।

উনিশশো নব্বইয়ের কোনো এক দিনে
তুমি দূর থেকে হেঁটে এসেছিলে,
আর একজন তরুণ
তোমাকে দেখার জন্য দাঁড়িয়ে ছিল।

তুমি এসেছিলে।

তার অপেক্ষা শেষ হয়েছিল।

কিন্তু সে জানত না-

সেই ছোট্ট অপেক্ষার ভেতরেই
আরেকটি দীর্ঘ অপেক্ষার বীজ
নিঃশব্দে রোপিত হয়ে গেছে।

আজ আমি যদি ফিরে যেতে পারতাম
সেই প্রথম অপেক্ষার বিকেলে,

দেখতাম-

একটি তরুণ ছেলে দাঁড়িয়ে আছে,
বারবার পথের দিকে তাকাচ্ছে।

আমি তার পাশে গিয়ে দাঁড়াতাম।

সে হয়তো আমাকে চিনত না।

আমি বলতাম না
আমি তার ভবিষ্যৎ।

বলতাম না
সামনের পথ কত দীর্ঘ।

বলতাম না
একদিন সেই মেয়েটিই তাকে
দূরে থাকতে বলবে।

বলতাম না
সে সত্যিই দূরে থাকবে
প্রায় তিন দশক।

কারণ ভবিষ্যতের ভার দিয়ে
তার প্রথম অপেক্ষার সৌন্দর্যটুকু
নষ্ট করতে চাইতাম না।

শুধু বলতাম-

“অপেক্ষা করো।
তবে মনে রেখো-
যদি কোনোদিন সে না আসতে চায়,
তার পথের দিকে চেয়ে থেকো না।
তাকে যেতে দিও।

ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর অপেক্ষা
মানুষটিকে ফিরে পাওয়ার জন্য নয়-
তার স্বাধীনতার প্রতি
নিজের সম্মানটুকু অটুট রাখার জন্য।”

তারপর হয়তো দূরে
তোমাকে দেখা যেত।

ছেলেটির চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠত।

সে আমার কথা ভুলে
তোমার দিকে তাকাত।

আর আমি
আজকের এই বয়স নিয়ে
ধীরে ধীরে সেখান থেকে চলে আসতাম।

কারণ আমি জানি-

সেদিন তুমি এসে
তার কয়েক মিনিটের অপেক্ষা শেষ করেছিলে।

কিন্তু একই সঙ্গে
তার হৃদয়ে এমন এক অনুভূতির জন্ম দিয়েছিলে,
যার শেষের তারিখ
কোনো ক্যালেন্ডারে লেখা ছিল না।

সেদিন তাই শুধু প্রেম নয়-

অপেক্ষারও জন্ম হয়েছিল।

আর এত বছর পরে
আমি প্রথমবার বুঝেছি-

তোমার জন্য অপেক্ষা করতে করতে নয়,
তোমাকে অপেক্ষা থেকে মুক্তি দিতে শিখেই
আমার ভালোবাসা বড় হয়েছে।

তোমার নাম লিখিনি

তোমার নাম লিখিনি-
অথচ কতবার লিখেছি তোমাকে।

পাতার পর পাতা ভরে গেছে,
রাতের পর রাত ফুরিয়েছে,
কলমের কালি শুকিয়েছে কতবার-
শুধু তোমার নামটি
কেমন করে যেন
প্রতিটি কবিতার বাইরে থেকে গেছে।

কেন লিখিনি?

ভয় ছিল?

হয়তো।

লজ্জা?

তাও হয়তো।

কিংবা মনে হয়েছিল-
নাম লিখে দিলে
আমার একান্ত গোপন অনুভূতিটি
হঠাৎ পৃথিবীর সম্পত্তি হয়ে যাবে।

তাই তোমাকে নাম দিইনি।

শুধু লিখেছি-

তুমি।

‘তুমি’-

কী ছোট্ট একটি শব্দ!

মাত্র দুটি অক্ষরের মধ্যে
কী করে যে একজন সম্পূর্ণ মানুষ
জায়গা করে নিতে পারে,
তখন প্রথম শিখেছিলাম।

আমার কবিতায়
‘তুমি’ মানেই তুমি।

অন্য কারও হওয়ার
কোনো সুযোগ ছিল না।

কেউ যদি সেই পাণ্ডুলিপি পড়ত,
হয়তো জিজ্ঞেস করত-

“এই তুমি কে?”

আমি হয়তো হেসে বলতাম-

“কেউ না।”

কী সহজ মিথ্যা!

যে ‘কেউ না’কে নিয়ে
একজন তরুণ রাত জেগে লিখছে,
সে কী করে কেউ না হয়?

সে তো তখন
তার অক্ষরের সবচেয়ে জীবন্ত মানুষ।

তোমার নাম আমার জানা ছিল।

ক্লাসের ভিড়ে শুনেছি হয়তো,
কোনো বন্ধুর মুখে,
কোনো তালিকায়,
কোনো সাধারণ কথার মধ্যে।

প্রথম যেদিন নামটি শুনলাম,
মনে হয়েছিল-

নামেরও কি সৌন্দর্য হয়?

তারপর বুঝলাম,
নামটি সুন্দর ছিল কি না জানি না,
আমি তাকে সুন্দর শুনেছিলাম
কারণ সেটি তোমার নাম।

মানুষ যখন কাউকে ভালোবাসে,
তার নামের উচ্চারণেও
একটি আলাদা সুর শুনতে পায়।

অন্যেরা স্বাভাবিকভাবে বলে।

প্রেমে পড়া মানুষটি
মনে মনে আরেকবার বলে।

কখনো খাতার কোণে
তোমার নাম লিখতে গিয়ে থেমেছি।

প্রথম অক্ষরটি লিখেছি হয়তো,
তারপর কেটে দিয়েছি।

মনে হয়েছে,
কেউ দেখে ফেলবে।

কেউ বুঝে ফেলবে।

বন্ধুরা হাসবে।

প্রশ্ন করবে।

আর আমি কী উত্তর দেব?

বলব-

হ্যাঁ,
একটি মেয়েকে দেখেছি।

তার সঙ্গে আমার
তেমন কোনো কথাই হয়নি।

তবু তাকে নিয়ে কবিতা লিখছি?

তরুণ বয়সে
নিজের গভীরতম অনুভূতিকে
মানুষ কত যত্নে লুকিয়ে রাখে!

যেন প্রকাশ পেলেই
তার সৌন্দর্য কমে যাবে।

তাই তোমার জন্য
আমি কত নাম বানিয়েছিলাম মনে মনে।

কখনো তুমি ছিলে
‘অচেনা’।

কখনো
‘প্রথম আলো’।

কখনো
‘দূরের মানুষ’।

কখনো
‘নীরবতা’।

কখনো আবার
কোনো সম্বোধনই ছিল না।

কবিতা শুরু হয়েছে সরাসরি-

“তোমায়…”

হয়তো সেইভাবেই এসেছিল-

“তোমায় দেবো নাকো তৃপ্তি বিভোর সুখের মেতে,
অন্তর আমার সইবে নাকো তোমার বেদনার চিৎকারে।”

এখানেও তোমার নাম নেই।

আজ ভাবি-
কী আশ্চর্যভাবে
আমার সেই তরুণ হৃদয়টি
নিজেই যেন বুঝেছিল-

ভালোবাসার জন্য
সবসময় নামের প্রয়োজন হয় না।

নাম আসলে কী?

কাউকে ডাকার একটি উপায়?

মানুষকে অন্য মানুষ থেকে
আলাদা করার চিহ্ন?

কিন্তু আমার কাছে
তুমি তো আগে থেকেই আলাদা ছিলে।

হাজার মানুষের ভিড়ে
তোমাকে চিনতে
নাম ধরে ডাকতে হতো না।

দূর থেকে তোমার হাঁটা দেখলেই
চিনতাম।

মাথা একটু ঘোরানোর ভঙ্গি,
বই ধরে রাখার ধরন,
বন্ধুদের মাঝে দাঁড়ানোর সেই পরিচিত ছায়া-

সব মিলিয়ে
তোমার নামের আগেই
তোমাকে চিনে ফেলেছিল আমার চোখ।

তবু কখনো কখনো
নির্জন রাতে
তোমার নামটি উচ্চারণ করেছি।

খুব আস্তে।

এত আস্তে যে
নিজের কান ছাড়া
আর কেউ শুনতে পায়নি।

নামটি বলেই চুপ হয়ে গেছি।

মনে হয়েছে-
এই একটি শব্দের পরে
আর কোনো বাক্যের প্রয়োজন নেই।

কী বলব?

ভালোবাসি?

তখনও কি নিশ্চিত ছিলাম
এটাই ভালোবাসা?

তোমাকে চাই?

‘চাওয়া’ শব্দটিই
কেমন যেন কঠিন মনে হতো।

কারণ তোমাকে চাওয়ার সঙ্গে
তোমাকে পাওয়ার দাবি
জুড়ে দিতে মন চাইত না।

তাই শুধু নামটি বলতাম।

তারপর নীরবতা।

একদিন হয়তো
সেই নামের পাশে
আমার নাম লিখে দেখেছিলাম।

দুটি নাম পাশাপাশি।

তরুণ বয়সের
নিরীহ এক কল্পনা।

কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে
আবার মুছে দিয়েছি।

কারণ বাস্তবের পৃথিবীতে
দুটি নাম পাশাপাশি থাকবে কি না
তা শুধু একজনের ইচ্ছায় হয় না।

এই সাধারণ সত্যটি
হয়তো তখন পুরোপুরি বুঝিনি।

কিন্তু কোথাও যেন অনুভব করেছিলাম।

তাই কাগজেও
তোমাকে নিজের পাশে
জোর করে রাখিনি।

তারপর একদিন
আমাদের গল্পের ভাষা বদলে গেল।

তোমার কাছ থেকে
দূরে থাকার কথা এলো।

আমি দূরে গেলাম।

তখন তোমার নাম
আরও বেশি না-লেখা হয়ে উঠল।

আগে নাম লিখিনি
লজ্জায়, সংকোচে, গোপন আনন্দে।

পরে লিখিনি
সম্মানে।

কারণ যে মানুষটি
দূরত্ব চেয়েছে,
তার নামকে নিজের আবেগের পতাকা বানিয়ে
পৃথিবীর সামনে ওড়ানো
আমার কাছে ভালোবাসা মনে হয়নি।

তাই তুমি থেকে গেলে-

নামহীন।

বছর যেতে লাগল।

একসময় তোমার নাম
প্রতিদিনের উচ্চারণ থেকে
অনেক দূরে সরে গেল।

নতুন মানুষের নাম শিখেছি,
শত শত নাম লিখেছি,
কত কাগজে স্বাক্ষর করেছি,
কত তালিকা পড়েছি-

কিন্তু হঠাৎ কোথাও
তোমার নামের সঙ্গে মিল আছে
এমন কোনো শব্দ দেখলে
এক মুহূর্তের জন্য
সময় থমকে গেছে।

স্মৃতি তখন বলেছে-

মনে আছে?

আমি বলেছি-

আছে।

মানুষের স্মৃতি
বড় অদ্ভুত।

মুখ ঝাপসা হয়।

ঘটনার তারিখ ভুলে যায়।

কে কী বলেছিল
তার শব্দ বদলে যায়।

কিন্তু কোনো কোনো নাম
মনের এমন গভীরে লেখা থাকে
যেখানে বয়সের হাত
সহজে পৌঁছাতে পারে না।

আমি তোমার নাম লিখিনি।

তবু ভুলিনি।

এ কি তবে
না-লেখারই আরেক রকম লেখা?

কাগজে লিখলে
কালি মুছে যেতে পারে।

খাতা হারাতে পারে।

যেমন হারিয়েছে
আমার সেই বিশাল পাণ্ডুলিপি।

কিন্তু যে নামটি
কাগজে লিখিনি,
সে নামই হয়তো
সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় থেকে গেছে।

আজ সেই হারানো পাণ্ডুলিপির কথা ভাবলে
মাঝে মাঝে কল্পনা করি-

যদি কোনোদিন
কোথাও থেকে সেটি ফিরে আসে?

পুরোনো কাগজ,
হলদে হয়ে যাওয়া পাতা,
কালি ফিকে,
কোনো কোনো শব্দ আর পড়া যায় না।

আমি পাতা উল্টাব।

একটি কবিতা।

আরেকটি কবিতা।

তারপর আরও একটি।

সবখানে তুমি।

কিন্তু কোথাও তোমার নাম নেই।

কেউ পড়লে হয়তো বলবে-

“কাকে নিয়ে এত লেখা?”

আমি এবারও হয়তো
তোমার নাম বলব না।

শুধু বলব-

“একজন ছিল।”

‘ছিল’ বলাটা অবশ্য ভুল।

কারণ মানুষটি তো আছে।

নিজের জীবনে,
নিজের পৃথিবীতে,
নিজের আনন্দ-বেদনা নিয়ে।

শুধু আমার কাছ থেকে দূরে।

তাই হয়তো বলা উচিত-

“একজন আছে-
যাকে আমি আমার স্মৃতির চেয়ে
আমার বাস্তবতায় কম দেখেছি।”

কী অদ্ভুত সম্পর্ক!

দেখা নেই।

কথা নেই।

কোনো দাবি নেই।

তবু নামটি মনে আছে।

আজ আমাদের বয়স
ষাটের কাছাকাছি।

এখন নামের সঙ্গে
অনেক পরিচয় যুক্ত হয়েছে নিশ্চয়ই।

জীবন আমাদের প্রত্যেককে
কত ভূমিকা দিয়েছে।

মানুষ আর শুধু
বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই তরুণ বা তরুণী থাকে না।

সময় তাকে
অনেক সম্পর্কের,
অনেক দায়িত্বের মানুষ করে তোলে।

আমি সেই সমস্ত পরিচয়ের প্রতি
সম্মান রেখেই
তোমাকে স্মরণ করতে চাই।

তাই আজও
তোমার নাম লিখছি না।

এ কবিতায়ও নয়।

পরের কবিতাতেও হয়তো নয়।

কারণ এই কাব্যের পাঠকের
তোমার নাম জানার প্রয়োজন নেই।

তারা শুধু জানুক-

উনিশশো নব্বইয়ে
একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে
একজন তরুণ একটি মেয়েকে দেখেছিল।

তারপর একদিন
তার খাতা খুলে লিখেছিল-

‘তুমি’।

আর সেই ‘তুমি’ শব্দটি
কীভাবে যেন
একটি জীবনের চেয়েও দীর্ঘ হয়ে গেল।

যদি কোনোদিন
এই কবিতাগুলো তোমার চোখে পড়ে,
তুমি হয়তো নিজের নাম খুঁজবে।

পাবে না।

তখন হয়তো ভাববে-

এ কি সত্যিই আমাকে নিয়ে?

আমি কোনো উত্তর দেব না।

কারণ তোমার মনে যদি প্রশ্নটি জন্মায়,
তার উত্তরও তোমার কাছেই থাকুক।

আমি শুধু এতটুকু চাই-

কোনো একটি পঙ্‌ক্তি পড়ে
যদি হঠাৎ উনিশশো নব্বইয়ের
সেই ক্যাম্পাসটি তোমার মনে পড়ে,

যদি এক মুহূর্তের জন্য
তোমার মনে হয়-

কেউ একজন কি সত্যিই
এত নীরবে আমাকে ভালোবেসেছিল?

তবে নামের আর কী প্রয়োজন?

আজ তাই
সাদা পাতার সামনে বসে
আমি আবার লিখি-

তোমার চোখ,
তোমার হেঁটে যাওয়া,
ক্লাস শেষে তোমার চলে যাওয়া,
একটি বেঞ্চের পাশে তোমার নীরবতা,
আমার অপেক্ষা-

সব লিখি।

শুধু তোমার নাম লিখি না।

কারণ এতদিনে বুঝেছি-

কিছু নাম কাগজে লিখলে
শুধু একটি শব্দ হয়,
আর না লিখে সারাজীবন বহন করলে
একটি সম্পূর্ণ কবিতা হয়ে যায়।

তোমার নামটি তাই
আমার কবিতার কোথাও নেই-

অথচ,

আমার সমস্ত কবিতার
সবচেয়ে স্পষ্ট নাম
তুমিই।

অপ্রেরিত প্রথম চিঠি

চিঠিটা লিখেছিলাম-
কিন্তু তোমাকে দেওয়া হয়নি।

কতবার ভাঁজ করেছি,
কতবার খুলেছি,
কতবার মনে হয়েছে-
কাল দেব।

তারপর সেই ‘কাল’
আর কোনোদিন আসেনি।

চিঠির শুরুতে কী লিখেছিলাম?

“প্রিয়”-?

না,
শব্দটি লিখে কেটে দিয়েছিলাম।

তোমাকে ‘প্রিয়’ বলার অধিকার
তখন কে দিয়েছিল আমাকে?

তারপর লিখেছিলাম হয়তো-

“তোমাকে কিছু কথা বলতে চাই।”

সেটিও কেমন আনুষ্ঠানিক লাগল।

শেষ পর্যন্ত
কোনো সম্বোধন ছাড়াই লিখেছিলাম-

“জানি না কেন তোমাকে এই চিঠি লিখছি

সত্যিই জানতাম না।

শুধু জানতাম,
সামনে দাঁড়িয়ে যে কথাগুলো বলতে পারি না,
কাগজের সামনে বসলে
তারা একে একে বেরিয়ে আসে।

লিখেছিলাম-

তোমাকে প্রথম দেখার কথা।

লিখেছিলাম-
তোমার পাশ দিয়ে গেলে
কেন হঠাৎ আমার স্বাভাবিক হাঁটা
অস্বাভাবিক হয়ে যায়।

লিখেছিলাম-
ক্লাস শেষে তোমাকে দেখলে
কেন দিনটাকে পূর্ণ মনে হয়।

হয়তো লিখেছিলাম-

“তুমি এসব কিছু জানো না।
জানার প্রয়োজনও নেই।
শুধু আমার মনে হলো,
কথাগুলো কোথাও বলা দরকার।”

তারপর কলম থেমেছিল।

কারণ একটি প্রশ্ন
বারবার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছিল-

চিঠিটি দিলে তুমি কী ভাববে?

তুমি কি অবাক হবে?

বিরক্ত?

অস্বস্তিতে পড়বে?

নাকি হেসে উড়িয়ে দেবে?

আমার নিজের কষ্টের চেয়ে
সেদিন হঠাৎ তোমার অস্বস্তির কথাটিই
বড় হয়ে উঠেছিল।

তাই চিঠিটা ভাঁজ করলাম।

বইয়ের মধ্যে রেখে দিলাম।

পরদিন সঙ্গে নিলাম।

তুমি সামনে দিয়ে গেলে।

চিঠিটি আমার ব্যাগে।

তুমি কয়েক হাত দূরে।

শুধু হাত বাড়ালেই
হয়তো একটি গল্প
অন্যদিকে মোড় নিতে পারত।

কিন্তু হাত বাড়াইনি।

তুমি চলে গেলে।

আমি ব্যাগে হাত দিয়ে
ভাঁজ করা কাগজটি ছুঁয়ে দেখলাম।

সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম-

সব লেখা পাঠানোর জন্য লেখা হয় না।

কিছু চিঠি
প্রাপকের হাতে না পৌঁছেও
লেখকের জীবন বদলে দেয়।

দিন কয়েক পরে
চিঠিটা আবার পড়েছিলাম।

নিজের লেখা পড়ে
নিজেরই লজ্জা হয়েছিল।

কী আবেগ!

কী সরলতা!

কী ভয়ংকর সত্যতা!

ছিঁড়ে ফেলতে গিয়েও পারিনি।

রেখে দিয়েছিলাম
সেই পাণ্ডুলিপির কোনো এক পাতার ভেতর।

আজ পাণ্ডুলিপি নেই।

চিঠিটিও নেই।

শুধু মনে আছে-
একটি চিঠি ছিল।

যার ঠিকানা ছিল তোমার কাছে,
কিন্তু যাত্রা শেষ হয়েছিল
আমার নিজের বুকের মধ্যেই।

আজ এত বছর পরে
মনে হয়-

ভালোই হয়েছিল।

কারণ তোমাকে ভালোবাসার ইতিহাসে
আমার প্রথম চিঠিটি
তোমার ওপর কোনো উত্তর দেওয়ার দায় চাপায়নি।

সে চুপচাপ থেকে গেছে।

যেমন থেকে গেছে
আমার অনেক কথা।

তাই আজ
সেই হারানো চিঠিটির উদ্দেশে লিখি-

তুমি পৌঁছাওনি বলে দুঃখ নেই।

তুমি সাক্ষী ছিলে-
একজন তরুণ প্রথমবার
নিজের হৃদয়কে কাগজে দেখে
ভয় পেয়েছিল।

আর সেই ভয়েই
তোমাকে ভাঁজ করে রেখে দিয়েছিল।

কিছু চিঠির সবচেয়ে নিরাপদ ডাকঘর
হয়তো মানুষের নিজের হৃদয়।

একটু কথা বলবে?

“একটু কথা বলবে?”

মাত্র তিনটি শব্দ।

কিন্তু এই তিনটি শব্দ বলতে
কত দিন লেগেছিল আমার!

রাতে ঠিক করতাম-
কাল বলব।

সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে
নিজেকে বোঝাতাম-

এতে এমন কী আছে?

একজন মানুষ
আরেকজন মানুষের সঙ্গে
কথা বলতেই পারে।

তুমি তো কোনো দূরের নক্ষত্র নও।

তুমিও মানুষ।

আমিও মানুষ।

তবু তোমাকে সামনে দেখামাত্র
আমার সমস্ত যুক্তি
কোথায় যেন পালিয়ে যেত।

তুমি চলে যেতে।

আমি দাঁড়িয়ে থাকতাম।

তারপর মনে মনে বলতাম-

“একটু কথা বলবে?”

তুমি তখন অনেক দূরে।

কী অদ্ভুত!

মানুষ সামনে থাকলে
যে বাক্য বলা যায় না,
সে চলে গেলে
সেই বাক্য কত সহজ হয়ে যায়!

একদিন ঠিক করলাম-

আজ বলবই।

আর পিছিয়ে আসব না।

তোমাকে দূর থেকে দেখলাম।

তুমি এগিয়ে আসছ।

আমার বুকের মধ্যে
কেউ যেন দ্রুত ঘণ্টা বাজাচ্ছে।

আর কয়েক পা।

আমি প্রস্তুত।

তুমি কাছে এলে।

আমি মুখ তুললাম।

হয়তো বলেছিলাম-

“শুনবেন…”

তারপর?

আজ আর মনে নেই
ঠিক কী ঘটেছিল।

হয়তো তুমি থেমেছিলে।

হয়তো বলেছিলে-“জি?”

হয়তো আমাদের প্রথম সামান্য কথোপকথন
এভাবেই শুরু হয়েছিল।

স্মৃতি শব্দগুলো হারিয়েছে।

কিন্তু অনুভূতিটা রেখে দিয়েছে।

তোমার সামনে দাঁড়িয়ে
প্রথম কয়েকটি কথা বলার সময়
মনে হয়েছিল-

এতদিন যে মানুষটিকে
কবিতার মধ্যে রেখেছি,
সে আজ আমার সামনে
বাস্তব কণ্ঠে কথা বলছে!

তোমার কণ্ঠস্বর-

সেটিও কি
আমি পরে কবিতায় লিখেছিলাম?

নিশ্চয়ই।

কারণ তখন তোমার সঙ্গে যুক্ত
প্রতিটি নতুন আবিষ্কারই
আমার কাছে কবিতার বিষয় ছিল।

কথা খুব বেশি হয়নি।

হওয়ার কথাও নয়।

হয়তো কয়েকটি সাধারণ বাক্য।

পড়াশোনা নিয়ে।

ক্লাস নিয়ে।

অথবা এমন কোনো বিষয়
যার কথা আজ আর একেবারেই মনে নেই।

কিন্তু কথার বিষয়টি হারিয়ে গেলেও
সেই কথার আনন্দ
কী করে যেন থেকে গেছে।

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে
নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সফল মানুষ
মনে হয়েছিল কি?

হয়তো।

অথচ অর্জন?

মাত্র কয়েকটি বাক্য!

আজকের বয়সে
ভাবলে মৃদু হাসি আসে।

কিন্তু সেই হাসির সঙ্গে
একটু মায়াও মিশে থাকে।

কারণ এখন বুঝি-

যৌবনের আনন্দের জন্য
বড় ঘটনার প্রয়োজন হয় না।

প্রিয় মানুষের সঙ্গে
দুই মিনিট কথা বলাও
একটি সম্পূর্ণ বিকেলকে
আলোকিত করে দিতে পারে।

সেদিনের পর
“একটু কথা বলবে?”
আর শুধু প্রশ্ন ছিল না।

সেটি হয়ে উঠেছিল
আমার সাহসের প্রথম ছোট্ট পরীক্ষা।

আমি পাশ করেছিলাম কি না জানি না।

শুধু জানি-

সেদিন কয়েকটি কথা বলার পর
আমার হারানো পাণ্ডুলিপিতে
আরও কয়েকটি পৃষ্ঠা বেড়েছিল।

আর আজ এত বছর পরে
সেই কথাগুলোর একটিও মনে নেই।

শুধু মনে আছে-

তুমি কথা বলেছিলে।

কখনো কখনো
মানুষ কথাগুলো ভুলে যায়,

কিন্তু যার কণ্ঠে শুনেছিল-
তাকে ভুলতে পারে না।

তোমার হাসির দিন

সেদিন তুমি হেসেছিলে।

কী কারণে?

মনে নেই।

আমার কোনো কথায়?

হয়তো নয়।

বন্ধুর কোনো কথায়,
কোনো ছোট্ট ঘটনায়,
অথবা এমন কিছুতে
যা আমার সঙ্গে একেবারেই সম্পর্কিত ছিল না।

তবু তোমার সেই হাসি
আমার দিনের সঙ্গে
কেমন করে যেন সম্পর্ক তৈরি করে ফেলেছিল।

তুমি হেসেছিলে-

আমি দেখেছিলাম।

এইটুকুই।

কিন্তু কোনো কোনো দৃশ্যের জন্য
জীবনের কাছে
এর বেশি কিছু চাওয়ার প্রয়োজন হয় না।

তোমার হাসি খুব জোরে ছিল না।

হয়তো চোখের কোণে
একটু আলো নেমেছিল,
ঠোঁটের কাছে
একটি সহজ বাঁক।

আমি দূর থেকে তাকিয়ে ছিলাম।

আর মনে হয়েছিল-

মানুষ সুখী হলে
তাকে কত সুন্দর দেখায়!

সেদিন প্রথম
একটি অদ্ভুত ইচ্ছা হয়েছিল।

আমি চাইছিলাম
তুমি এমন করেই হাসো।

আমার জন্য নয়।

আমাকে দেখে নয়।

আমার কোনো কথাতেও নয়।

শুধু হাসো।

তোমার জীবনে
যে কারণেই আনন্দ আসুক,
সে কারণটির প্রতি
আমার হঠাৎ কৃতজ্ঞতা জন্মেছিল।

আজ বুঝি,
সেই ছোট্ট অনুভূতির মধ্যেই
আমার ভালোবাসার ভবিষ্যৎ
লুকিয়ে ছিল।

কারণ একদিন আমাকে শিখতে হয়েছে-

তোমার সুখের সঙ্গে
আমার উপস্থিতি অপরিহার্য নয়।

তোমার জীবন
আমাকে ছাড়াও পূর্ণ হতে পারে।

আর ভালোবাসা যদি সত্যি হয়,
তবে সেই পূর্ণতার বিরুদ্ধে
আমার কোনো অভিযোগ থাকার কথা নয়।

কিন্তু সেদিন এত কিছু ভাবিনি।

সেদিন শুধু
তোমার হাসিটা মনে রেখেছিলাম।

রাতে লিখতে বসে
হয়তো কত উপমাই দিয়েছি-

ফুল,

ভোর,

বৃষ্টি শেষে রোদ,

নদীর জলে আলো।

আজ সবই একটু বেশি মনে হয়।

তোমার হাসি
তোমার হাসির মতোই ছিল।

তার জন্য অন্য কিছুর
উপমা দরকার ছিল না।

তারপর জীবনে
কত হাসিমুখ দেখেছি।

নিজেও কতবার হেসেছি।

কিন্তু কখনো কখনো
অকারণে মনে পড়ে-

উনিশশো নব্বইয়ের
কোনো এক বিকেলে
একটি মেয়ে হেসেছিল।

সে জানত না
কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা
এক তরুণ সেই হাসিটুকু
নিজের স্মৃতির মধ্যে
সযত্নে রেখে দিচ্ছে।

আজ যদি জানতে পারি
তুমি ভালো আছ,
হাসছ,
নিজের মানুষদের নিয়ে সুখে আছ-

তাহলে আমার সেই তরুণ বয়সের
একটি পুরোনো প্রার্থনা
পূর্ণ হয়েছে বলেই মনে করব।

কারণ আমি তোমার হাসির কারণ
হতে পারিনি হয়তো,

কিন্তু কখনো চাইনি
তোমার চোখের জলের কারণ হতে।

সেই জন্যই হয়তো
আজও আমার হারানো পঙ্‌ক্তি ফিরে আসে-

“তোমায় দেবো নাকো তৃপ্তি বিভোর সুখের মেতে,
অন্তর আমার সইবে নাকো তোমার বেদনার চিৎকারে।”

আজ তার অর্থ
আরও পরিষ্কার বুঝি।

ভালোবাসা শুধু
প্রিয় মানুষের সঙ্গে সুখী হতে চাওয়া নয়।

কখনো ভালোবাসা মানে-

নিজে সেই সুখের অংশ না হয়েও
তার হাসিটি অক্ষত দেখতে চাওয়া।

তোমার সেই হাসির দিন
আমাকে হয়তো
প্রথম এই কথাটিই শিখিয়েছিল।

যে বিকেল আর ফেরেনি

কিছু বিকেল
ক্যালেন্ডার থেকে চলে যায়,

কিন্তু জীবন থেকে যায় না।

সেই বিকেলটিও তেমন।

তারিখ মনে নেই।

মাসটিও নিশ্চিত নই।

শুধু মনে আছে
আলোটা কেমন নরম ছিল,
ক্যাম্পাসে দিনের ব্যস্ততা
ধীরে ধীরে কমে আসছিল,

আর তুমি ছিলে।

আজ মনে করতে গেলে
ঘটনাগুলো কুয়াশার মতো।

কোথায় দাঁড়িয়েছিলে?

কার সঙ্গে?

আমি কত দূরে ছিলাম?

কথা হয়েছিল?

নাকি শুধু দেখা?

স্মৃতি আর নিশ্চিত করে না।

তবু কেন সেই বিকেলটি
এত আলাদা হয়ে আছে?

হয়তো সেদিন প্রথম
তোমাকে দেখে মনে হয়েছিল-

এই মানুষটি
আমার জীবনে থেকে যাবে।

কীভাবে থাকবে,
কোন পরিচয়ে থাকবে,
তার কিছুই জানতাম না।

তরুণ হৃদয়
ভবিষ্যতের মানচিত্র পড়ে না।

সে শুধু অনুভব করে।

সেদিন আমারও মনে হয়েছিল-

এই মুহূর্তটি
যেন শেষ না হয়।

সূর্য একটু ধীরে নামুক।

ক্লাসগুলো একটু পরে শেষ হোক।

মানুষগুলো একটু কম তাড়া করুক।

তুমি আর কয়েক মিনিট
এই প্রাঙ্গণে থাকো।

আমি কিছু চাইছি না।

কথাও নয়।

শুধু সময়টুকু
আরেকটু দীর্ঘ হোক।

কিন্তু সময়
প্রেমিকের অনুরোধ শোনে না।

বিকেল গড়িয়ে গেল।

তুমি চলে গেলে।

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।

আকাশের রং বদলাল।

ক্যাম্পাসের পথ ফাঁকা হলো।

তারপর আমিও ফিরে এলাম।

জানতাম না-

কোনো একটি সাধারণ বিকেলকে
শেষবারের মতো দেখছি কি না
মানুষ কখনো আগে থেকে বুঝতে পারে না।

পরে আরও বিকেল এসেছে।

তোমাকে দেখেছি।

হয়তো কথা হয়েছে।

আরও কবিতা লিখেছি।

তবু সেই একটি বিকেল
কীভাবে যেন
নিজের জন্য আলাদা একটি জায়গা বানিয়ে নিয়েছে।

হয়তো কারণ
সেদিন ভালোবাসা ছিল
একেবারেই নির্ভার।

তখনও ভবিষ্যতের জটিলতা আসেনি।

কোনো নিষেধ ছিল না।

কোনো দীর্ঘ দূরত্ব ছিল না।

ত্রিশ বছরের না-দেখা
তখনো আমাদের সামনে
অদৃশ্য হয়ে অপেক্ষা করছিল।

সেদিনের আমি জানতাম না
একদিন তোমাকে না-দেখাই
আমার ভালোবাসার সবচেয়ে দীর্ঘ অধ্যায় হবে।

সে শুধু জানত-

তুমি আছ।

এই ক্যাম্পাসে।

এই শহরে।

হয়তো আগামীকালও দেখা হবে।

মানুষের জীবনে
‘আগামীকাল’ শব্দটি
তখন কত নিশ্চিন্ত ছিল!

আজ জানি-

সব আগামীকাল
গতকালের পুনরাবৃত্তি নয়।

একদিন শেষ দেখা হয়।

শেষ কথা হয়।

শেষবার কেউ
একটি পরিচিত পথ দিয়ে চলে যায়।

কিন্তু আমরা জানি না
সেটিই শেষ।

তাই বিদায়ও বলা হয় না।

আজ যদি সেই বিকেলটি
আর একবার ফিরে পেতাম?

না-

তোমার কাছে যেতাম না।

ইতিহাস বদলানোর চেষ্টাও করতাম না।

শুধু দূর থেকে
আরেকটু মন দিয়ে দেখতাম।

গাছগুলো।

আলো।

ক্যাম্পাসের পথ।

তোমার হেঁটে যাওয়া।

আমার তরুণ বয়স।

সবকিছু।

কারণ আজ জানি
স্মৃতি তৈরি হওয়ার মুহূর্তে
মানুষ বুঝতে পারে না
সে ভবিষ্যতের জন্য
কত মূল্যবান কিছু জমা করছে।

তারপর সময় আমাদের
দূরে নিয়ে গেল।

একসময় তোমার বলা সীমার কাছে এসে
আমি থেমে গেলাম।

আর ফিরে যাইনি।

বছরের পর বছর
তোমাকে সামনে থেকে না-দেখার মধ্যে
সেই পুরোনো বিকেলগুলোই
আমার স্মৃতিতে তোমাকে ধরে রেখেছে।

তাই তুমি সেখানে
বয়স বাড়াওনি।

স্মৃতির নিষ্ঠুর সৌন্দর্য এটাই-

সে মানুষকে
একটি নির্দিষ্ট বয়সে থামিয়ে রাখতে পারে।

আজ বাস্তবের তুমি
সময়ের দীর্ঘ পথ হেঁটেছ।

আমিও হেঁটেছি।

কিন্তু সেই বিকেলে?

তুমি এখনো তরুণী।

আমি এখনো
কিছুটা দূরে দাঁড়ানো এক তরুণ।

সূর্য নামছে।

ক্যাম্পাস ফাঁকা হচ্ছে।

আমাদের কেউ জানে না
সামনে কত বছর অপেক্ষা করছে।

কখনো খুব ইচ্ছে করে
সেই তরুণটির কাছে গিয়ে বলি-

“এই বিকেলটা ভালো করে দেখে রাখো।
একদিন পৃথিবীর অনেক কিছু তোমার থাকবে,
অনেক কিছু হারিয়েও যাবে;
কিন্তু এই কয়েক মিনিট
কোনোদিন ফিরে পাবে না।”

তারপর তাকে আর কিছু বলব না।

ভবিষ্যতের দুঃখ জানাব না।

কারণ সেদিনের আনন্দের ওপর
আগামীর ছায়া ফেলার অধিকার
আমারও নেই।

আমি শুধু দূরে দাঁড়িয়ে দেখব-

তুমি চলে যাচ্ছ।

তরুণ আমি তাকিয়ে আছে।

বিকেলটি ধীরে ধীরে
সন্ধ্যার মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে।

আর সময়
নিঃশব্দে একটি দরজা বন্ধ করছে।

যে দরজা খুলে
আজও মাঝে মাঝে ফিরে যাই-

কিন্তু যার ওপারে গিয়ে
কিছু ছুঁতে পারি না।

শুধু দেখতে পাই।

আর বুঝতে পারি-

জীবনে কিছু বিকেল দ্বিতীয়বার আসে না,
কারণ তারা ফিরে আসার জন্য নয়-
সারাজীবন মনে থাকার জন্য আসে।

আমার গোপন পাণ্ডুলিপি

কখন যে কয়েকটি কবিতা
একটি পাণ্ডুলিপি হয়ে উঠল-
আমি নিজেও বুঝিনি।

প্রথমে ছিল একটি সাদা পাতা,
তারপর আরেকটি,
তারপর রাতের পর রাত
তোমাকে না-বলা কথাগুলো
নিজেদের জন্য জায়গা করে নিল কাগজে।

একদিন হঠাৎ দেখি-
পাতাগুলো আর আলাদা নেই।

তারা যেন পরস্পরের হাত ধরে
একটি দীর্ঘ গল্প হয়ে গেছে।

সেই গল্পের কোনো নাম ছিল না,
প্রকাশকের ঠিকানা ছিল না,
পাঠকের অপেক্ষাও ছিল না।

ছিল শুধু একজন লেখক-

আর একজন মানুষ,
যে জানতই না
তাকে নিয়ে একটি বই লেখা হচ্ছে।

পাণ্ডুলিপিটি লুকিয়ে রাখতাম।

কেন?

কেউ পড়ে ফেলবে বলে।

বন্ধুরা জানলে হাসবে,
পরিবারের কেউ দেখলে প্রশ্ন করবে-

“এত কবিতা কাকে নিয়ে?”

আমি কী বলতাম?

বলতাম কি-

বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মেয়েকে দেখেছি,
তার সঙ্গে আমার জীবনের
কোনো প্রতিশ্রুতি নেই,
কোনো সম্পর্কের নাম নেই,

তবু তার একটি হাসি,
একটি দৃষ্টি,
একটি পথ দিয়ে হেঁটে যাওয়া
আমাকে এত শব্দ দিয়েছে
যে সেগুলো আর একটি খাতায় ধরে না?

কে বুঝত?

তাই পাণ্ডুলিপিটি
আমার একার ছিল।

কখনো গভীর রাতে
সব লেখা একসঙ্গে পড়তাম।

একটি কবিতায় তোমার চোখ।

আরেকটিতে তোমার হাসি।

কোথাও তোমার হেঁটে যাওয়া।

কোথাও একটি বিকেল।

কোথাও তুমি নেই-
শুধু তোমাকে না-দেখার শূন্যতা।

আর আশ্চর্য হয়ে ভাবতাম-

আমি কি সত্যিই
এত কিছু লিখেছি?

একজন মানুষকে নিয়ে
এত কথা আমার মধ্যে ছিল?

তখনো বুঝিনি-

আমি আসলে শুধু তোমাকে লিখছিলাম না।

লিখছিলাম নিজেকেও।

তোমাকে দেখার পর
আমি যে নতুন মানুষটিকে
নিজের মধ্যে আবিষ্কার করেছিলাম,
পাণ্ডুলিপিটি ছিল তারও দিনলিপি।

কখনো মনে হতো
তোমাকে দেব।

সবটা নয়।

দুই-একটি কবিতা।

দেখি তুমি কী বলো।

তারপর ভয় হতো।

যদি তুমি পড়ো
আর নীরব হয়ে যাও?

যদি তোমার ভালো না লাগে?

আরও ভয়-

যদি বুঝতে পারো
এই সমস্ত ‘তুমি’ আসলে তুমি?

তাহলে?

আমার গোপন পৃথিবীর
সমস্ত দরজা একসঙ্গে খুলে যাবে।

আমি প্রস্তুত ছিলাম না।

তাই পাণ্ডুলিপি
তোমার কাছে যায়নি।

তবু মনে মনে
তোমাকে তার প্রথম পাঠক বানিয়েছিলাম।

একটি কবিতা লিখে ভাবতাম-

এটা পড়লে তুমি কী বলতে?

কোনো পঙ্‌ক্তিতে কি হাসতে?

কোনোটিতে বিরক্ত হতে?

কোনো একটি জায়গায় এসে
এক মুহূর্ত থামতে?

হয়তো বলতে-

“এত কিছু কেন লিখেছ?”

আমি কী উত্তর দিতাম?

হয়তো বলতাম-

“কারণ তোমাকে যতটুকু বলতে পেরেছি,
তার চেয়ে অনেক বেশি
না-বলা থেকে গেছে।”

পাণ্ডুলিপিটি বড় হতে থাকল।

আমার বয়সও।

একসময় মনে হলো
এটি শুধু কবিতার খাতা নয়-

আমার তরুণ জীবনের
একটি গোপন দেশ।

সেখানে প্রবেশের
একটিই দরজা ছিল-

তুমি।

অথচ সেই দেশের নাগরিকত্ব
তোমাকে কোনোদিন দেওয়া হয়নি।

কী আশ্চর্য!

তোমাকে কেন্দ্র করে তৈরি পৃথিবীতে
তুমিই ছিলে সবচেয়ে অজ্ঞাত মানুষ।

তারপর জীবন বদলেছে।

আমাদের দূরত্ব বদলেছে।

অনেক কিছু এমনভাবে ঘটেছে
যা সেই প্রথম দিকের কবিতাগুলো
কল্পনাও করতে পারেনি।

আর কোনো এক সময়ে
পাণ্ডুলিপিটি হারিয়ে গেল।

প্রথম যখন বুঝলাম
সেটি আর খুঁজে পাচ্ছি না,

মনে হয়েছিল
কেউ যেন আমার যৌবনের
একটি অংশ নিয়ে গেছে।

কাগজ তো আবার পাওয়া যায়।

কবিতা আবার লেখা যায়।

কিন্তু যে রাতে
যে বয়সে
যে হৃদয়ে
শব্দগুলো প্রথম এসেছিল-

সেই রাত,
সেই বয়স,
সেই হৃদয় কি ফেরানো যায়?

যায় না।

আজ এত বছর পরে
আবার যখন লিখছি,

বুঝতে পারি-

আমি হারানো পাণ্ডুলিপিটি
হুবহু ফিরিয়ে আনছি না।

সেটি অসম্ভব।

আমি বরং
তার ছাইয়ের মধ্যে থেকে
কিছু উষ্ণতা তুলে আনছি।

সেদিনের ভাষা নেই,
কিন্তু অনুভূতির ছায়া আছে।

সেদিনের হাত নেই,
কিন্তু স্মৃতি আছে।

আর তুমি-

তুমি বাস্তবে কত বদলেছ জানি না,

কিন্তু সেই পাণ্ডুলিপির মধ্যে
তুমি আজও
উনিশশো নব্বইয়ের আলোয় দাঁড়িয়ে।

তাই আজ আর পাণ্ডুলিপি হারানোর জন্য
শুধু দুঃখ করি না।

মনে হয়-

হয়তো তার হারিয়ে যাওয়ার মধ্যেও
কোনো অদ্ভুত অর্থ ছিল।

সে যদি থেকে যেত,
আমি হয়তো পুরোনো শব্দই পড়তাম।

এখন সে নেই বলে
আমাকে স্মৃতির আরও গভীরে যেতে হচ্ছে।

আবার খুঁজতে হচ্ছে
সেই তরুণটিকে।

আবার তাকে জিজ্ঞেস করছি-

তুমি কী দেখেছিলে?

কেন লিখেছিলে?

কেন এত বছর পরেও
একটি মুখের স্মৃতি
তোমার মধ্যে বেঁচে আছে?

সে কোনো উত্তর দেয় না।

শুধু আমার সামনে
একটি সাদা পাতা রেখে যায়।

আমি বুঝি-

হারিয়ে যাওয়া পাণ্ডুলিপিটি
আসলে শেষ হয়নি।

তার শেষ পাতার পরে
প্রায় ত্রিশ বছরের
একটি দীর্ঘ সাদা জায়গা ছিল।

আজ সেখানে আবার
অক্ষর ফুটছে।

আর প্রথম পাণ্ডুলিপির মতোই
নতুন পাণ্ডুলিপিতেও
একটি নাম লেখা নেই।

শুধু প্রতিটি পাতার ভেতরে
একজন মানুষ নিঃশব্দে বলে যাচ্ছে-

তুমি।

পাতার পর পাতায় তুমি

একটি পাতা লিখে
থামতে চেয়েছিলাম।

পারিনি।

দ্বিতীয় পাতায় গেলে
মনে হয়েছিল-

এই তো শেষ।

তারপর তৃতীয়।

চতুর্থ।

কখন যে গুনতে ভুলে গেলাম
জানি না।

শুধু দেখলাম-

পাতার পর পাতায় তুমি।

একই মানুষকে নিয়ে
এত কী লেখা যায়?

আজ প্রশ্নটি সহজ।

তখন উত্তরও সহজ ছিল-

তুমি প্রতিদিন একই ছিলে না।

একদিন তোমার হাসি লিখেছি।

একদিন নীরবতা।

একদিন তোমাকে দেখেছি
রোদের মধ্যে।

আরেকদিন হয়তো
মেঘলা বিকেলে।

একদিন তুমি খুব কাছে দিয়ে গেছ।

আরেকদিন
সারাদিন তোমাকে দেখিনি।

তোমার উপস্থিতি যেমন কবিতা ছিল,
তোমার অনুপস্থিতিও
কম কবিতা ছিল না।

কখনো একটি পৃষ্ঠা জুড়ে
শুধু অপেক্ষা।

কখনো অভিমান-

যার কোনো অধিকারই ছিল না আমার।

কখনো আনন্দ-

যার কারণ তুমি জানতেই না।

কখনো এমন কথাও লিখেছি
যা বাস্তবে তোমাকে
কোনোদিন বলতে পারতাম না।

কাগজ বড় সহনশীল।

সে প্রশ্ন করে না-

“তোমার অধিকার কী?”

সে বলে না-

“এত আবেগ কেন?”

সে শুধু জায়গা দেয়।

আর আমি
সেই জায়গার মধ্যে
তোমাকে লিখে গেছি।

একদিন হয়তো লিখেছি-

তোমাকে চাই।

পরদিন সেই শব্দ কেটে দিয়ে লিখেছি-

তোমাকে ভালো চাই।

দুটি বাক্যের মধ্যে
মাত্র একটি শব্দের পার্থক্য।

কিন্তু আজ বুঝি,
আমার পুরো জীবন হয়তো
এই দুটি বাক্যের মাঝের পথটিই হেঁটেছে।

“তোমাকে চাই”

সেখানে আমার আকাঙ্ক্ষা।

“তোমাকে ভালো চাই”

সেখানে তুমি।

প্রথমটি যৌবনের।

দ্বিতীয়টি
সময়ের কাছে শেখা ভালোবাসা।

তখন অবশ্য
আমি এত স্পষ্ট করে জানতাম না।

তখন পাতার পর পাতায়
তোমাকে নিজের মতো করে এঁকেছি।

কখনো বাস্তবের চেয়ে সুন্দর।

কখনো বাস্তবের চেয়ে কাছে।

কখনো এমন কথাও
তোমার মুখে বসিয়েছি
যা তুমি কোনোদিন বলোনি।

আজ সেই তরুণ কবির কাছে
আমি একটু ক্ষমা চাই।

কারণ ভালোবাসা মানুষকে
কখনো কখনো কল্পনায়
অন্য মানুষটির হয়ে কথা বলায়।

কিন্তু বাস্তবের তুমি
তোমার নিজের।

তোমার নীরবতার অর্থও
তোমারই।

আজ তাই তোমাকে নিয়ে লিখলেও
তোমার হয়ে কোনো উত্তর লিখতে চাই না।

শুধু আমার অনুভূতিটুকু লিখি।

পাতাগুলো জমেছিল।

কোনো কোনো পাতায়
কালির দাগ।

কোথাও কাটাকাটি।

কোথাও একটি শব্দ
বারবার বদলানো।

কোনো কবিতার পাশে হয়তো
তারিখ লিখেছিলাম।

কোনোটির পাশে কিছুই না।

আজ যদি পাণ্ডুলিপিটি পেতাম,
আমি কি সেই তারিখগুলো দেখে
নিজের জীবন পুনর্গঠন করতে পারতাম?

হয়তো।

বলতে পারতাম-

এই দিনে তাকে দেখেছিলাম।

এই দিনে কথা হয়েছিল।

এই কবিতাটি লিখেছিলাম
তাকে না-দেখার রাতে।

কিন্তু পাণ্ডুলিপি নেই।

তাই এখন তারিখ নয়-
শুধু অনুভূতি দিয়ে
সময় চিনতে হয়।

কী আশ্চর্য-

কাগজে লেখা তুমি হারিয়ে গেছ,
স্মৃতিতে লেখা তুমি রয়ে গেছ।

তাই কখনো মনে হয়
মানুষ ভুল জায়গায়
স্থায়িত্ব খোঁজে।

আমরা ভাবি-

লিখে রাখলে থাকবে।

ছবি তুললে থাকবে।

কাগজ সংরক্ষণ করলে থাকবে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত
কত দলিল হারায়,
কত ছবি নষ্ট হয়,
কত পাণ্ডুলিপি উধাও হয়ে যায়।

আর একটি সাধারণ বিকেল
মস্তিষ্কের কোনো অদৃশ্য কোণে
চল্লিশ বছর বেঁচে থাকে।

আজ নতুন করে
পাতার পর পাতা লিখছি।

তবে এবার পার্থক্য আছে।

সেদিন লিখেছিল
একজন তরুণ-

যে ভবিষ্যৎ জানত না।

আজ লিখছে
একজন প্রায় ষাট বছরের মানুষ-

যে জানে গল্পের অনেকটাই।

সেদিনের পাতায় ছিল
প্রত্যাশা।

আজকের পাতায় আছে
স্মৃতি।

সেদিন প্রশ্ন ছিল-

“তুমি কি কোনোদিন আমার হবে?”

আজ সে প্রশ্ন নেই।

আজ শুধু বলি-

তুমি তোমারই থেকো।

আমার কবিতায় তোমাকে
কোনো সম্পর্কের শিকলে বাঁধব না।

শুধু আমার জীবনের
যে অংশটুকুতে তুমি সত্যিই ছিলে,
সেটুকু শব্দে রেখে দেব।

হয়তো এই নতুন পাতাগুলোও
একদিন হারিয়ে যাবে।

কাগজের এই তো নিয়তি।

তবু লিখছি।

কারণ লেখা মানে
সবসময় কিছু সংরক্ষণ করা নয়।

কখনো লেখা মানে
নিজের ভেতরের একটি দীর্ঘ নীরবতাকে
একটি ভাষা দেওয়া।

আর আমার সেই নীরবতার
প্রায় প্রতিটি পাতায়-

এখনো তুমি।

তুমি কি কিছু বুঝেছিলে?

আজ এত বছর পরে
একটি প্রশ্ন মাঝে মাঝে ফিরে আসে-

তুমি কি কিছু বুঝেছিলে?

আমার চোখের অস্থিরতা?

তোমার সামনে পড়লে
হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়া?

ক্লাস শেষে
অকারণে একটু বেশি সময় থাকা?

তোমাকে দেখলে
মুখে লুকাতে না-পারা
সেই সামান্য আনন্দ?

কিছু কি
তোমার চোখ এড়িয়ে যায়নি?

আমি তো ভেবেছিলাম
সব লুকিয়ে রেখেছি।

কী নিখুঁত অভিনয়!

তুমি সামনে এলে
অন্যদিকে তাকিয়েছি।

তুমি পাশ দিয়ে গেলে
এমনভাবে হেঁটেছি
যেন কোনো কিছুই হয়নি।

বন্ধুদের সামনে
তোমার নাম এড়িয়ে গেছি।

কবিতায়ও নাম লিখিনি।

নিজেকে মনে হতো
গোপনীয়তার এক অসাধারণ কারিগর।

আজ ভাবি-

সম্ভবত আমি
একেবারেই তা ছিলাম না।

কারণ প্রথম ভালোবাসা
চোখ থেকে লুকানো
এত সহজ নয়।

তুমি কি দেখেছিলে
আমি কখনো কথা বলতে এসে
কথা ভুলে গেছি?

তুমি কি বুঝেছিলে
একটি সাধারণ প্রশ্ন করার আগে
আমি মনে মনে দশবার
তার মহড়া দিয়েছি?

তুমি কি লক্ষ করেছিলে
তোমার সঙ্গে দু-মিনিট কথা হওয়ার পরে
আমার মুখে অকারণ আলো?

নাকি এসবই
শুধু আমার নিজের মনে বড় ঘটনা ছিল?

তোমার পৃথিবীতে
আমি তখন হয়তো
অসংখ্য পরিচিত মুখের
একটি সাধারণ মুখমাত্র।

সেই সম্ভাবনাটিই
আজ সবচেয়ে সত্য বলে মনে হয়।

কখনো মনে হয়
তুমি নিশ্চয়ই বুঝেছিলে।

মানুষের অনুভূতি
সবসময় শব্দ চায় না।

চোখ কখনো বলে দেয়।

অতিরিক্ত নীরবতা বলে দেয়।

অকারণ উপস্থিতি বলে দেয়।

আবার পরক্ষণেই মনে হয়-

না।

হয়তো কিছুই বোঝোনি।

আর সেটিও স্বাভাবিক।

কারণ একজন মানুষ
যে গল্প নিজের মধ্যে লিখছে,
অন্যজন কেন তার পাণ্ডুলিপি
না-পড়েই বুঝবে?

যদি বুঝে থাকো-

তখন কী ভেবেছিলে?

এই প্রশ্নের উত্তর
আমি বানিয়ে নিতে চাই না।

তুমি কী অনুভব করেছিলে,
তা বলার অধিকার শুধু তোমার।

আমি আমার কবিতায়
তোমাকে দিয়ে এমন কোনো কথা বলাব না
যা বাস্তবে তুমি বলোনি।

এত বছরে অন্তত
এইটুকু শিখেছি-

স্মৃতির প্রতি যেমন সত্য থাকা দরকার,
অন্য মানুষের নীরবতার প্রতিও
তেমনই সত্য থাকা দরকার।

তবু তরুণ বয়সের আমি
এত সংযত ছিল না।

তুমি একটু হাসলে
সে ভাবত-

হয়তো তুমি বুঝেছ।

তুমি একবার তাকালে
সে সারারাত সেই দৃষ্টির
অর্থ খুঁজত।

একটি সাধারণ সৌজন্যকে
সে কখনো কখনো
অতিরিক্ত আলোয় দেখেছে।

এখন তার জন্য
তাকে দোষ দিতে পারি না।

প্রথম প্রেমের চোখে
পৃথিবীর প্রতিটি ছোট সংকেতই
বড় হয়ে দেখা দেয়।

হয়তো কোনো এক সময়ে
তুমি সত্যিই বুঝেছিলে।

হয়তো সেই কারণেই
পরে একদিন
দূরত্বের প্রয়োজন অনুভব করেছিলে।

যদি তাই হয়ে থাকে-

আজ আমি তোমাকে
কোনো প্রশ্ন করি না।

কারণ তোমার অস্বস্তি,
তোমার সিদ্ধান্ত,
তোমার সীমারেখা-

সবই তোমার অধিকার।

আর ভালোবাসার নামে
সেই অধিকার অতিক্রম করলে
আমার এত কবিতার
কোনো অর্থই থাকে না।

তাই তুমি যখন দূরত্ব চেয়েছিলে,
আমি দূরে গেছি।

কঠিন ছিল।

তবু গেছি।

কিন্তু তারও অনেক আগে-

সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে
আমার প্রশ্নটি ছিল খুব সরল-

তুমি কি জানো?

জানো কি
একজন মানুষ তোমাকে দেখে
কবিতা লিখছে?

জানো কি
তোমার একটি হাসি
কারও রাতের পৃষ্ঠা ভরিয়ে দেয়?

জানো কি
তোমাকে না দেখলে
কারও বিকেল অসম্পূর্ণ লাগে?

জানো কি-

তোমার নাম না লিখেও
একটি সম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি
শুধু তোমার হয়ে উঠছে?

আজ আর জানতে চাই না
তুমি তখন কতটুকু বুঝেছিলে।

উত্তরটি না-জানাই
হয়তো এই গল্পের সৌন্দর্য।

কারণ তুমি যদি বলো-

“হ্যাঁ, বুঝেছিলাম,”

তবুও অতীত বদলাবে না।

আর যদি বলো-

“না, কিছুই বুঝিনি,”

তাতেও আমার অনুভূতি
মিথ্যা হয়ে যাবে না।

ভালোবাসার সত্যতা
সবসময় দুই মানুষের
একই অনুভূতির ওপর নির্ভর করে না।

একজনের অনুভূতিও সত্য হতে পারে-

যতক্ষণ সে অন্যজনের
স্বাধীনতাকে সত্য বলে মানে।

তাই আজ প্রশ্নটি
তোমার কাছে নয়।

আমি প্রশ্ন করি
উনিশশো নব্বইয়ের সেই তরুণটিকে-

“তুমি কি চেয়েছিলে
সে বুঝুক?”

সে হয়তো কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলবে-

“চেয়েছিলাম।

আবার ভয়ও পেয়েছিলাম।”

“কেন?”

“কারণ সে বুঝে ফেললে
আমাকে উত্তর দিতে হতো
একটি আরও বড় প্রশ্নের।”

“কোন প্রশ্ন?”

সে মাথা নিচু করবে।

তারপর খুব আস্তে বলবে-

“আমি কি সত্যিই তাকে ভালোবাসি?”

আমি আজকের বয়স থেকে
তার দিকে তাকিয়ে থাকব।

উত্তর দেব না।

কারণ পরের অধ্যায়ে
সেই উত্তরটি
তাকেই খুঁজে পেতে হবে।

ভালোবাসি-বলতে পারিনি

শব্দটি খুব ছোট-

ভালোবাসি।

কত মানুষ প্রতিদিন বলে।

কত সহজে বলে।

কখনো হাসতে হাসতে,
কখনো চিঠিতে,
কখনো বিদায়ের আগে,
কখনো ফিরে এসে।

অথচ তোমার সামনে
এই একটি শব্দ
আমার কাছে হয়ে উঠেছিল
পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন উচ্চারণ।

কতবার বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

রাতে।

নিজের ঘরে।

একলা।

কেউ সামনে নেই-

তখন কী সহজ!

আমি স্পষ্ট বলতে পারি-

“আমি তোমাকে ভালোবাসি।”

একবার।

দুবার।

মনে মনে শতবার।

তারপর সকাল হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই।

তুমি সামনে আসো।

আর সেই একই বাক্য
হঠাৎ এত ভারী হয়ে যায়
যে আমার কণ্ঠ
তাকে বহন করতে পারে না।

কেন বলতে পারিনি?

শুধু ভয়?

প্রত্যাখ্যানের ভয় নিশ্চয়ই ছিল।

তুমি যদি বলো-

“না”?

তাহলে?

তোমাকে দেখার
এই ছোট ছোট আনন্দগুলোও
কি হারিয়ে যাবে?

তোমার পাশ দিয়ে
স্বাভাবিকভাবে হাঁটার সুযোগটুকুও
কি থাকবে না?

এই ভয় আমাকে থামিয়েছে।

কিন্তু শুধু এই ভয় নয়।

আরেকটি প্রশ্নও ছিল-

আমি বললে
তোমাকে কি উত্তর দিতেই হবে?

আমার একটি অনুভূতি
তোমার ওপর কি
একটি সিদ্ধান্তের বোঝা হয়ে যাবে?

তখন হয়তো
এত সুন্দর ভাষায় ভাবিনি।

শুধু অনুভব করেছিলাম-

তাড়াহুড়া করতে চাই না।

তাই ‘ভালোবাসি’ শব্দটি
কাগজে গেছে।

তোমার কাছে যায়নি।

কখনো লিখেছি সরাসরি।

তারপর কেটে দিয়েছি।

কখনো উপমার আড়ালে রেখেছি।

কখনো লিখেছি-

তোমাকে দেখলে ভালো লাগে।

কখনো-

তোমাকে না দেখলে দিন ফাঁকা।

কখনো-

তোমার সুখ চাই।

সবই বলেছি।

শুধু মূল কথাটি ছাড়া।

যেন একটি নদী
সমুদ্রের খুব কাছে এসে
বারবার দিক বদলে ফেলছে।

একদিন হয়তো সুযোগ ছিল।

তুমি সামনে।

চারপাশে খুব বেশি মানুষ নেই।

কথাও হচ্ছিল।

আমার মনে হচ্ছিল-

আজ।

আজ বলে ফেলব।

তুমি কিছু একটা বলছিলে।

আমি শুনছিলাম,
আবার শুনছিলাম না।

কারণ আমার মাথার ভেতর
একটি মাত্র বাক্য ঘুরছিল-

বলব?

তারপর তুমি থামলে।

একটি ছোট্ট নীরবতা।

সেই নীরবতার মধ্যেই
আমি বলতে পারতাম।

“আমি…”

শব্দটি হয়তো
ঠোঁট পর্যন্ত এসেছিল।

তারপর থেমে গেল।

আমি অন্য কথা বললাম।

কী কথা?

মনে নেই।

মানুষ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
না-বলা কথার মুহূর্তে
যে অপ্রয়োজনীয় কথাটি বলে,
সেটিই বোধহয় সবচেয়ে দ্রুত ভুলে যায়।

তুমি চলে গেলে।

আমি নিজের ওপর রাগ করলাম।

কেন বললাম না?

আর কতদিন?

পরেরবার বলব।

নিশ্চয়ই বলব।

কিন্তু পরেরবারও
একই ঘটনা।

তারপর আরও একবার।

এভাবে ‘পরেরবার’
আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ
অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতিগুলোর একটি হয়ে গেল।

আজ এত বছর পরে
আমি কি অনুতপ্ত?

প্রশ্নটি সহজ নয়।

আমার একটি অংশ বলে-

বললে কী ক্ষতি হতো?

অন্তত তুমি জানতে।

হারিয়ে যাওয়া পাণ্ডুলিপির
হাজার পঙ্‌ক্তির বদলে
মাত্র একটি বাক্যই তো যথেষ্ট ছিল।

আমি তোমাকে ভালোবাসি।

কিন্তু আমার আরেকটি অংশ বলে-

না-বলাটিও
আমাদের গল্পের অংশ।

সেই নীরবতা না থাকলে
এই কবিতাগুলো কি জন্মাত?

কে জানে।

তবে একটি কথা আজ স্পষ্ট-

ভালোবাসি বলা মানে
কাউকে পাওয়া নয়।

এটি কোনো দাবি নয়।

কোনো চুক্তিও নয়।

একজন মানুষ বলতে পারে-

আমি তোমাকে ভালোবাসি।

অন্যজন বলতে পারে-

আমি তোমাকে ভালোবাসি না।

দুটি বাক্যই সত্য হতে পারে।

দুটি সত্য পাশাপাশি থেকেও
কেউ অপরাধী হয় না।

এই সহজ জ্ঞানটি
তখন যদি থাকত!

হয়তো প্রত্যাখ্যানকে
এত ভয় পেতাম না।

হয়তো বুঝতাম-

তোমার ‘না’
আমার অনুভূতিকে অপমান করে না;

যেমন আমার ‘ভালোবাসি’
তোমাকে ‘হ্যাঁ’ বলতে বাধ্য করে না।

কিন্তু জীবন
সব শিক্ষা সময়মতো দেয় না।

কিছু শিক্ষা আসে
ঘটনার বহু বছর পরে।

তখন আর পুরোনো পরীক্ষায়
উত্তর বদলানোর সুযোগ থাকে না।

শুধু বোঝা যায়-

কোথায় ভুল ছিল,
কোথায় সরলতা,
কোথায় ভয়,
আর কোথায় ছিল
এক ধরনের নিষ্পাপ সৌন্দর্য।

তারপর একদিন
তোমার কাছ থেকে
দূরে থাকার সীমা এলো।

সেদিন থেকে
‘ভালোবাসি’ বলার প্রশ্নটিও
অন্য অর্থ পেল।

যে কথাটি একসময়
সাহসের অভাবে বলিনি,

পরে সেই কথাটি
না-বলাই হয়ে উঠল সম্মান।

কারণ তুমি যখন দূরত্ব চেয়েছ,
তখন আমার অনুভূতি জানাতে গিয়ে
বারবার তোমার দরজায় দাঁড়ানো
ভালোবাসা হতো না।

তাই থেমে গেছি।

প্রায় ত্রিশ বছর।

কী দীর্ঘ সময়!

এই সময়ে শব্দটি
আমার ভেতর থেকে
মুছে যাওয়ার কথা ছিল কি?

হয়তো।

কিন্তু অনুভূতির নিজস্ব
কোনো ক্যালেন্ডার নেই।

তবু আজকের ভালোবাসা
সেদিনের মতো নয়।

সেদিন বলার মধ্যে ছিল-

তোমাকে চাই।

আজ না-বলার মধ্যে আছে-

তুমি ভালো থেকো।

সেদিন কাছে আসার আকাঙ্ক্ষা ছিল।

আজ দূরত্বের প্রতিও সম্মান আছে।

সেদিন ভবিষ্যৎ চাইতাম।

আজ অতীতের সত্যটুকুই
যথেষ্ট মনে হয়।

যদি কোনোদিন
তুমি এই কবিতাটি পড়ো,

আমি চাই না
এটি তোমার কাছে
কোনো প্রশ্ন হয়ে পৌঁছাক।

আমি চাই না
তুমি উত্তর খুঁজো।

এটি কোনো নতুন প্রস্তাব নয়।

কোনো পুরোনো দরজা
খোলার অনুরোধও নয়।

এ শুধু একটি স্বীকারোক্তি-

একজন মানুষ
তার তরুণ বয়সে
একটি কথা বলতে পারেনি।

সেই না-বলা কথাটি
বহু বছর তার মধ্যে
কবিতা হয়ে থেকেছে।

আজ সে কথাটি
তোমার কাছে নয়-

সময়কে বলছে।

নিজের হারানো যৌবনকে বলছে।

সেই গোপন পাণ্ডুলিপিকে বলছে।

ক্যাম্পাসের পথকে,
বেঞ্চটিকে,
বিকেলের আলোকে বলছে-

হ্যাঁ, আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম।

আর যদি উনিশশো নব্বইয়ের
সেই তরুণটি আজ আমার সামনে এসে
অভিমান করে বলে-

“তুমি এত সহজে বলছ!
আমি কেন পারিনি?”

আমি তার হাত ধরে বলব-

“তুমি বলতে পারোনি বলেই
তোমার ভালোবাসা ছোট হয়নি।

কিছু ‘ভালোবাসি’
মানুষের মুখ থেকে বেরোয়,
কিছু চিঠিতে পৌঁছায়,
কিছু উত্তর পায়-

আর কিছু ‘ভালোবাসি’
সারাজীবন উচ্চারিত না হয়েও
একজন মানুষের সমস্ত কবিতার মধ্যে
নিঃশব্দে উচ্চারিত হতে থাকে।”

তোমাকে সেই কথাটি
আমি তখন বলতে পারিনি।

আজও তোমার সামনে দাঁড়িয়ে
বলতে যাচ্ছি না।

শুধু আমার কবিতার কাছে
এত বছর পরে স্বীকার করছি-

যে শব্দটি মুখে বলতে পারিনি,
আমার হারিয়ে যাওয়া পাণ্ডুলিপির
প্রতিটি পাতাই আসলে
সেই একটি শব্দের দীর্ঘ উচ্চারণ ছিল-

ভালোবাসি।

তোমার নীরব উত্তর

সব প্রশ্নের উত্তর
শব্দে আসে না।

কখনো একটি মুখ
কিছু না বলেও বলে দেয় অনেক কিছু,
কখনো চোখ সরিয়ে নেওয়া,
কখনো কথার মাঝখানে থেমে যাওয়া,
কখনো দূরত্বটুকু একটু বেড়ে যাওয়া-

মানুষকে এমন উত্তর দেয়
যার পাশে কোনো
‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ লেখা থাকে না।

তোমার নীরবতাও
একদিন আমার কাছে
তেমনই একটি উত্তর হয়ে এসেছিল।

আমি তখনও অপেক্ষায়।

ভাবছি-

হয়তো তুমি বুঝেছ,
হয়তো বুঝোনি।

হয়তো আমার কথাগুলো
তোমার কাছে পৌঁছেছে,
কিংবা আমার সমস্ত অস্থিরতা
শুধুই আমার ভেতরে ঘটছে।

তোমার মুখ দেখে
উত্তর খুঁজতে চাইতাম।

তুমি হাসলে-

মনে হতো,
হয়তো সব ঠিক আছে।

তুমি চুপ থাকলে-

মনে হতো,
হয়তো আমি ভুল করেছি।

তুমি স্বাভাবিকভাবে কথা বললে-

মনে হতো,
আমার আশঙ্কা অকারণ।

আবার তুমি একটু দূরে থাকলে
আমার ভেতরের সমস্ত আশা
হঠাৎ প্রশ্ন হয়ে যেত।

কী নিষ্ঠুরভাবে সরল ছিলাম!

তোমার প্রতিটি আচরণের
অর্থ খুঁজছিলাম-

যে অর্থ হয়তো
সেখানে ছিলই না।

আজ এত বছর পরে বুঝি-

অন্য মানুষের নীরবতার
নিজস্ব অধিকার আছে।

তাকে নিজের ইচ্ছামতো
অনুবাদ করা যায় না।

তুমি নীরব ছিলে বলে
আমি বলতে পারি না
তুমি আমাকে ভালোবেসেছিলে।

আবার এটাও বলতে পারি না
তোমার মনে কোনো অনুভূতিই ছিল না।

সেই ইতিহাসের অংশটি
তোমার।

আমার নয়।

আমার কাছে শুধু সত্য
আমার নিজের অনুভূতি।

তবু সেই সময়ের আমি
এতটা পরিণত ছিল না।

সে অপেক্ষা করত
একটি পরিষ্কার উত্তরের।

একটি বাক্য।

হয়তো-

“আমি বুঝেছি।”

কিংবা-

“এভাবে ভেবো না।”

যেকোনো কিছু।

কারণ অনিশ্চয়তার মধ্যে
মানুষ অদ্ভুতভাবে
নিজের জন্য শত উত্তর বানিয়ে ফেলে।

কোনো এক বিকেলে
তোমাকে খুব শান্ত মনে হয়েছিল।

আমি হয়তো কিছু বলতে চেয়েছিলাম।

তুমি শুনেছিলে।

তারপর খুব বেশি কিছু বলোনি।

সেই নীরবতার পরে
আমি অনেক রাত জেগেছিলাম।

ভাবছিলাম-

ওই চুপ করে থাকার মানে কী?

আমার পক্ষে?

আমার বিপক্ষে?

আজ মনে হয়-

কী অদ্ভুত প্রশ্ন!

তোমার নীরবতা
আমার পক্ষে কিংবা বিপক্ষে
হতেই হবে কেন?

তুমি তো কোনো আদালত নও।

ভালোবাসাও কোনো মামলা নয়
যেখানে রায় ঘোষণা করতে হবে।

তুমি একজন মানুষ-

নিজের অনুভূতি নিয়ে,
নিজের সংশয় নিয়ে,
নিজের জীবনের অধিকার নিয়ে।

সেই শিক্ষা অবশ্য
পরে এসেছে।

তখন তোমার নীরবতা
আমাকে আরও লিখিয়েছে।

একটি কবিতা।

তারপর আরেকটি।

হয়তো লিখেছিলাম-

তুমি কিছু বলো না কেন?

হয়তো লিখেছিলাম-

তোমার নীরবতার মধ্যেও
আমি উত্তর শুনি।

আজ সেই দ্বিতীয় কথাটির জন্য
আমার তরুণ বয়সকে
সংশোধন করতে ইচ্ছে করে।

না, তরুণ কবি-

সে যা বলেনি,
তা তার হয়ে তুমি বলো না।

তোমার কবিতা তোমার অনুভূতি বলুক।

তার নীরবতা
তারই থাকুক।

কত বছর লেগেছে
এই সহজ সত্যটি বুঝতে!

যখন আমরা কাউকে গভীরভাবে চাই,
তখন কখনো কখনো
আমরা তার একটি দৃষ্টি,
একটি হাসি,
একটি সৌজন্য-

সবকিছুকে নিজের আশার সঙ্গে
জুড়ে দিতে চাই।

কিন্তু ভালোবাসার পরিণতি
বোধহয় ঠিক উল্টো জায়গায়-

যখন মানুষ বলে,

আমি যা অনুভব করি,
তার দায় আমার।

তুমি যা অনুভব করো,
তার স্বাধীনতা তোমার।

তোমার নীরব উত্তর তাই
আজ আর আমাকে প্রশ্নে রাখে না।

বরং মনে হয়-

সেটি হয়তো
আমার জন্য প্রয়োজনীয় একটি বিরতি ছিল।

কারণ তার পরে
একদিন শব্দও এসেছিল।

স্পষ্ট শব্দ।

একটি সীমারেখা।

যা আর অনুমান করার মতো ছিল না।

সেদিন তোমার নীরবতার
সব অস্পষ্টতা শেষ হয়ে গেল।

তার আগের রাত পর্যন্ত
হয়তো আমি ভাবতে পেরেছি-

হয়তো।

হয়তো কোনোদিন।

হয়তো সময় লাগবে।

মানুষের আশা
‘হয়তো’ শব্দটিকে খুব ভালোবাসে।

একটি বন্ধ দরজার সামনেও
সে ভাবতে পারে-

দরজাটি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

কিন্তু কোনো একদিন
তুমি সেই ‘হয়তো’-এর জায়গায়
একটি স্পষ্ট সীমা এঁকে দিলে।

আর আমার সামনে দাঁড়িয়ে রইল
সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন-

আমি কি তোমার কথাকে
আমার ভালোবাসার চেয়ে বড় করে দেখতে পারব?

আজ উত্তরটি জানি।

তখন জানতাম না
আমি পারব কি না।

শুধু মনে আছে-

তোমার নীরব উত্তরগুলোর ভেতর দিয়ে
আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিলাম
সেই দিনের দিকে,

যেদিন তুমি
আর নীরব থাকবে না।

আর তোমার বলা কয়েকটি কথা
আমার পরের প্রায় ত্রিশ বছরের
দূরত্বের শুরু হয়ে যাবে।

যেদিন তুমি বারণ করলে

দিনটির তারিখ
আজ আর মনে নেই।

কিন্তু কিছু তারিখ
ক্যালেন্ডারে না থাকলেও
মানুষের জীবনে লেখা থাকে।

সেই দিনটি তেমন।

তুমি আমাকে বারণ করলে।

ঠিক কোন শব্দে বলেছিলে-
আজ হুবহু বলতে পারব না।

স্মৃতি দীর্ঘ সময় পেরোলে
বাক্যের শব্দ বদলে দেয়,
কিন্তু তার অর্থটুকু
অদ্ভুতভাবে অক্ষত রাখে।

আমি শুধু মনে রেখেছি-

তুমি দূরত্ব চেয়েছিলে।

আমার উপস্থিতি থেকে,
আমার অনুভূতি থেকে,
হয়তো আমার সেই নীরব অপেক্ষা থেকেও।

আর হঠাৎ
এতদিনের সমস্ত ‘হয়তো’
একটি স্পষ্ট বাস্তবতার সামনে
চুপ হয়ে গেল।

তোমার কথাগুলো শোনার মুহূর্তে
আমি কি কিছু বলেছিলাম?

হয়তো বলেছি।

হয়তো নিজের পক্ষে
কিছু বোঝাতে চেয়েছি।

হয়তো বলতে চেয়েছি-

আমি তো তোমার ক্ষতি চাইনি।

আমি তো শুধু ভালোবেসেছি।

কিন্তু এখন বুঝি-

কাউকে ভালোবাসা
তার কাছে আমার উপস্থিতিকে
অবশ্যই গ্রহণযোগ্য করে তোলে না।

আমার উদ্দেশ্য ভালো হলেই
তোমার অস্বস্তি মিথ্যা হয়ে যায় না।

এই শিক্ষা
সেদিন হৃদয় বুঝতে পারেনি।

পরে বুঝেছে।

সেদিন শুধু কষ্ট হয়েছিল।

খুব।

চারপাশের পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়
হঠাৎ যেন বদলে গেল।

যে পথ ধরে তোমাকে দেখেছি
সেই পথই কেমন অপরিচিত।

যে করিডোরে অপেক্ষা করেছি
সেখানে দাঁড়াতে ভয় লাগছিল।

বেঞ্চটি ছিল।

গাছগুলো ছিল।

ক্লাসের ঘণ্টাও
আগের মতোই বাজছিল।

শুধু আমি জানতাম-

আজ থেকে আমার হাঁটার নিয়ম বদলাবে।

আমি মনে মনে প্রশ্ন করেছিলাম-

এত কবিতা তবে কী হবে?

এই পাণ্ডুলিপি?

এই অপেক্ষা?

এই না-বলা কথাগুলো?

এতদিন ধরে
তোমাকে কেন্দ্র করে তৈরি
আমার গোপন পৃথিবীটির কী হবে?

কেউ উত্তর দেয়নি।

কারণ ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন সত্যগুলোর একটি-

অন্য একজন মানুষ ‘না’ বললে
আমাদের ভেতরের অনুভূতি সঙ্গে সঙ্গে মরে না।

তাকে শুধু
নতুনভাবে বাঁচতে শিখতে হয়।

সেদিন কি তোমার ওপর
অভিমান হয়েছিল?

নিশ্চয়ই।

আমি তো মানুষ।

কষ্টের প্রথম মুহূর্তে
যুক্তির চেয়ে অভিমানই আগে আসে।

মনে হয়েছিল-

তুমি বুঝলে না কেন?

আমার এত অনুভূতি
তুমি দেখলে না কেন?

তারপর অনেক পরে বুঝেছি-

তোমার কাজ
আমার অনুভূতির গভীরতা মাপা ছিল না।

তোমার কাজ ছিল
নিজের সত্য বলা।

আর তুমি সেটিই বলেছিলে।

হয়তো তোমারও
সেই কথাটি বলা সহজ ছিল না।

আমি জানি না।

আজও অনুমান করতে চাই না।

শুধু এটুকু মানি-

তোমার সিদ্ধান্ত
তোমার অধিকার ছিল।

আর আমার ভালোবাসার পরীক্ষা
সেদিনই সত্যিকার অর্থে শুরু হয়েছিল।

তোমাকে পাওয়ার সময় নয়।

তোমাকে না-পাওয়ার সম্ভাবনাতেও নয়।

বরং যখন তুমি বললে-

দূরে থাকো।

আমি কি সঙ্গে সঙ্গে
মেনে নিতে পেরেছিলাম?

মনের ভেতরে-না।

মানুষের অনুভূতিকে তো
আদেশ দিয়ে থামানো যায় না।

কিন্তু আচরণ?

সেখানে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

আমি বুঝলাম-

আমার হৃদয়
তোমাকে মনে রাখতেই পারে,

কিন্তু আমার পা
তোমার নির্ধারিত সীমানা
অতিক্রম করবে না।

সেদিন হয়তো
আমার পুরোনো দুই পঙ্‌ক্তির
সত্যিকারের পরীক্ষা হয়েছিল-

“তোমায় দেবো নাকো তৃপ্তি বিভোর সুখের মেতে,
অন্তর আমার সইবে নাকো তোমার বেদনার চিৎকারে।”

এই কথা যদি সত্য হয়,

তবে আমার ভালোবাসার কারণে
তোমার অস্বস্তি কেন হবে?

আমার আনন্দের জন্য
তোমাকে কোনো বোঝা
কেন বহন করতে হবে?

আমি যদি সত্যিই
তোমার বেদনা সহ্য করতে না পারি,

তবে আমার প্রথম কাজই তো
তোমার বেদনার কারণ থেকে
নিজেকে সরিয়ে নেওয়া।

এই উপলব্ধি
সেদিনই এত পরিষ্কার ছিল না।

সে এসেছে ধীরে।

কষ্টের ভেতর দিয়ে।

সময় নিয়ে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত
এই একটি সত্যই
আমাকে ধরে রেখেছে-

তোমাকে ভালোবাসার অধিকার
আমার হৃদয়ের থাকতে পারে,
কিন্তু তোমাকে বিরক্ত করার অধিকার
আমার নেই।

সেদিন তাই
একটি গল্প শেষ হয়নি।

বরং গল্পটির ধরন বদলে গেল।

তার আগে প্রেম ছিল
দেখার।

অপেক্ষার।

কথা বলার চেষ্টা।

কাছে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

সেদিনের পরে
প্রেম হয়ে গেল-

নিজেকে থামানো।

দূর থেকে থাকা।

না-দেখার অভ্যাস করা।

নিজের অনুভূতির ভার
নিজেই বহন করা।

তুমি হয়তো ভেবেছিলে
তোমার বারণের পরে
একদিন সব মুছে যাবে।

হয়তো আমিও তাই ভেবেছিলাম।

কিন্তু মুছে যায়নি।

তবু সেই না-মুছে যাওয়া
তোমার জন্য কোনো দাবি হয়ে ওঠেনি।

এই পার্থক্যটিই
সম্ভবত আমার জীবনের
সবচেয়ে দীর্ঘ শিক্ষা।

আজ এত বছর পরে
আমি সেই দিনের দিকে
রাগ নিয়ে তাকাই না।

বরং দেখি-

সেই দিনটিই
আমার ভালোবাসাকে
একটি কঠিন প্রশ্ন করেছিল:

“তুমি কি তাকে ভালোবাসো,
নাকি শুধু তাকে পেতে চাও?”

যদি শুধু পেতে চাইতাম,
তবে তোমার ‘না’-এর সঙ্গে
আমার যুদ্ধ হতো।

আর যদি ভালোবাসি-

তবে তোমার ‘না’কেও
তোমার অংশ হিসেবে
সম্মান করতে হবে।

সেদিন তুমি বারণ করলে।

আমি আহত হয়েছিলাম।

কিন্তু সময়ের দীর্ঘ পথে
একটি আশ্চর্য সত্য শিখলাম-

তোমার সেই বারণ
আমার ভালোবাসাকে শেষ করেনি।

বরং তার সামনে
একটি সীমারেখা এঁকে দিয়ে বলেছিল-

“এখান থেকে যদি সত্যিই ভালোবাসো,
তবে আর এক পা এগিয়ো না।”

আর আমি-

কষ্ট নিয়ে,
অসংখ্য না-বলা কথা নিয়ে,
হারিয়ে যেতে থাকা পাণ্ডুলিপি নিয়ে-

সেই রেখাটির সামনে
দাঁড়িয়ে গেলাম।

আমি থেমে গেলাম

তুমি বলেছিলে-
দূরে থাকো।

আমি থেমে গেলাম।

শুনতে কত সহজ!

মাত্র তিনটি শব্দ-

আমি থেমে গেলাম।

কিন্তু একটি মানুষ জানে
নিজের হৃদয়ের বিপরীত দিকে
হাঁটতে কত দীর্ঘ পথ লাগে?

পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে
সবকিছু আগের মতো ছিল।

মানুষ চলেছে।

বন্ধুরা কথা বলেছে।

ক্লাস হয়েছে।

দরজা খুলেছে।

ঘণ্টা বেজেছে।

শুধু আমার মধ্যে
একটি নতুন নিয়ম জন্ম নিয়েছে-

তোমাকে খুঁজব না।

কী কঠিন ছিল
প্রথম কয়েকটি দিন!

চোখ অভ্যাসবশত
সেই পরিচিত পথের দিকে যেতে চাইত।

আমি ফিরিয়ে আনতাম।

মনে হতো-

হয়তো তুমি ওইদিকে আছ।

আমি অন্যদিকে যেতাম।

ক্লাস শেষে
আগের মতো একটু দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করত।

আমি চলে আসতাম।

একটি মানুষকে
না-দেখার জন্যও
যে এত সচেতন হতে হয়,

আগে জানতাম না।

তখনই বুঝলাম-

অভ্যাসেরও স্মৃতি আছে।

আমার পা জানত
কোন পথে গেলে তোমাকে দেখা যায়।

আমার চোখ জানত
কোন ভিড়ে তোমাকে খুঁজতে হয়।

আমার সময় জানত
কোন ঘণ্টার পরে তুমি বের হতে পারো।

এখন আমাকে
নিজের প্রতিটি অভ্যাসকে
নতুন করে শেখাতে হলো-

ওই পথে যেও না।

ওইখানে দাঁড়িয়ো না।

অপেক্ষা করো না।

কতবার দূর থেকে
তোমার মতো কাউকে দেখে
হৃদয় চমকে উঠেছে!

তারপর সঙ্গে সঙ্গে
নিজেকে বলেছি-

না।

এখন তোমাকে দেখার জন্য
কাছে যাওয়া যাবে না।

তুমি যে দূরত্ব চেয়েছ,
সে দূরত্বের দায়িত্বও
আমার।

আমি থেমে গেলাম-

কিন্তু কবিতা?

সে থামল না।

রাতে এসে সে প্রশ্ন করত-

আজ তাকে দেখোনি?

আমি বলতাম-

না।

সে লিখত-

“আজ তাকে দেখিনি।”

পরদিন-

“আজও না।”

একসময় না-দেখাটিই
আমার লেখার নতুন বিষয় হয়ে গেল।

আগে লিখতাম
তোমার উপস্থিতি।

এখন লিখি
তোমার অনুপস্থিতির আকৃতি।

কী আশ্চর্য-

একজন মানুষ সামনে না থাকলেও
তার জন্য একটি শূন্য জায়গা
কী স্পষ্টভাবে দেখা যায়!

ক্যাম্পাসের ভিড়ে
হাজার মানুষ আছে।

তবু মনে হয়-

কেউ নেই।

কারণ যাকে চোখ
অভ্যাস করে ফেলেছিল,

সে আর চোখের সামনে নেই।

তুমি হয়তো কাছে কোথাও ছিলে।

একই শহরে।

হয়তো একই ক্যাম্পাসের
অন্য কোনো প্রান্তে।

তবু আমি নিজেকে বোঝালাম-

কাছে থাকা মানেই
দেখার অধিকার নয়।

এই কথাটি
তরুণ হৃদয়কে বোঝানো সহজ ছিল না।

সে প্রশ্ন করত-

শুধু একবার দেখলে কী হবে?

দূর থেকেই তো দেখব।

কথা বলব না।

কাছে যাব না।

শুধু একটি মুহূর্ত।

তখন আমার ভেতরে
আরেকটি কণ্ঠ বলত-

না।

তুমি যদি শুধু নিজের ইচ্ছাই শোনো,
তবে তার বারণকে সম্মান করলে কোথায়?

আমি ফিরে আসতাম।

এভাবেই দিন।

মাস।

তারপর বছর।

প্রথম দিকে
দিন গুনেছি কি?

হয়তো।

কতদিন দেখিনি।

কত মাস।

একসময় গোনা ছেড়ে দিয়েছি।

কারণ সময় যখন দীর্ঘ হয়
মানুষ ক্যালেন্ডার দিয়ে
অনুপস্থিতি মাপে না।

সে মাপে-

হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়ায়।

কোনো পুরোনো গানে।

কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে।

কোনো মেয়ের পরিচিত হাসির ভঙ্গিতে।

কোনো পিঙ্ক রঙের কাপড়ে।

কোনো চশমার আড়ালে
হঠাৎ পরিচিত চোখের স্মৃতিতে।

জীবন এদিকে
থেমে থাকেনি।

থেমে থাকা সম্ভবও নয়।

আমার নিজের পথ ছিল।

দায়িত্ব ছিল।

কাজ ছিল।

নতুন সকাল ছিল।

কত মানুষ এসেছে জীবনে।

কত ঘটনা।

কত সাফল্য ও ক্লান্তি।

কিন্তু জীবনের সেই চলমান নদীর নিচে
একটি ক্ষীণ স্রোত
নিজের মতো বয়ে গেছে।

তার নাম-

স্মৃতি।

কখনো মনে হয়েছে-

আমি কি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম
তোমাকে ভুলব না?

না।

কোনো প্রতিজ্ঞা ছিল না।

বরং হয়তো চেয়েছি
ভুলে যেতে।

মানুষের মনের ওপর
মানুষের কতটুকুই বা কর্তৃত্ব!

আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি-

কোথায় যাব।

কাকে ফোন করব।

কার দরজায় দাঁড়াব না।

কিন্তু কোনো একটি মুখ
কখন মনে পড়বে-

সে সিদ্ধান্ত সবসময়
আমাদের হাতে থাকে না।

এই জন্যই
আজ আমার মনে হয়-

আমি তোমাকে মনে রেখেছি
এটি বড় কথা নয়।

বড় কথা হলো-

তোমাকে মনে রেখেও
তোমার সামনে গিয়ে
নিজের স্মৃতির হিসাব চাইনি।

তুমি দূরত্ব চেয়েছিলে।

আমি যতটা পেরেছি
সে দূরত্ব রেখেছি।

প্রায় ত্রিশ বছর।

এই তিনটি শব্দ লিখতেও
আজ অবাক লাগে।

একটি মানুষের জীবনে
ত্রিশ বছর কম নয়।

কত ঋতু!

কত জন্মদিন!

কত ঈদ,
কত বর্ষা,
কত শীত।

কতবার পৃথিবী
নিজের চেহারা বদলেছে।

আমাদের মুখও বদলেছে।

কিন্তু যে সিদ্ধান্তটি
সেদিন নিয়েছিলাম-

তার রেখাটি
বহু বছর অতিক্রম করেছে।

আমি থেমে গিয়েছিলাম
তোমার পথে।

জীবনের পথে নয়।

এই পার্থক্যটি জরুরি।

কারণ প্রেমের নামে
নিজের জীবন থামিয়ে দেওয়া
আমি আজ মহৎ বলে মনে করি না।

জীবনকে বাঁচতে হয়।

নিজের দায়িত্ব পালন করতে হয়।

নিজের মানুষদের প্রতি
ন্যায় করতে হয়।

তোমার স্মৃতি আমার ছিল-

কিন্তু আমার জীবনও
তার নিজের অধিকার রাখত।

তাই আমি বেঁচেছি।

হেসেছি।

কাজ করেছি।

পৃথিবী দেখেছি।

সময় আমাকে
ধীরে ধীরে তরুণ থেকে
এই বয়সে নিয়ে এসেছে।

শুধু কোনো একটি দরজা
খোলার চেষ্টা করিনি।

কারণ তুমি বলেছিলে-

না।

আজ ফিরে তাকিয়ে
আমি সেই তরুণটিকে দেখি।

সে একটি পথের মোড়ে
দাঁড়িয়ে আছে।

একদিকে
তোমার দিকে যাওয়ার পুরোনো রাস্তা।

অন্যদিকে
নিজের দীর্ঘ ভবিষ্যৎ।

সে পেছন ফিরে
আরেকবার তাকায়।

তারপর ধীরে ধীরে
অন্য পথে হাঁটা শুরু করে।

তার চোখে জল আছে কি না
আমি জানি না।

কিন্তু তার পা আর ফিরে যায় না।

আমি আজ তার পাশে গিয়ে বলি-

“তুমি ভালোবাসা থামাতে পারোনি।
তার প্রয়োজনও ছিল না।

তুমি শুধু নিজেকে থামিয়েছিলে
যেখানে তোমার আর এগোনোর অধিকার ছিল না।

সেদিন তুমি তাকে হারাওনি শুধু-
সেদিন প্রথম শিখেছিলে,
কখন থেমে যেতে হয়।”

তোমার সীমানার বাইরে

তুমি একটি সীমানা এঁকেছিলে।

চোখে দেখা যায় না এমন।

কোনো দেয়াল নয়,
কোনো বেড়া নয়,
কোনো তালাবদ্ধ দরজাও নয়।

শুধু কয়েকটি কথা-

আর আমি বুঝেছিলাম,

এর ওপারে আমার আসা উচিত নয়।

প্রথম দিকে
সেই অদৃশ্য রেখাটি
খুব কাছে মনে হতো।

আমি এপাশে।

তুমি ওপাশে।

মনে হতো
একটু হাত বাড়ালেই হয়তো
পুরোনো দিন ছুঁয়ে ফেলতে পারি।

কিন্তু হাত বাড়াইনি।

কারণ সীমারেখার মূল্য
তার উচ্চতায় নয়-

যিনি এঁকেছেন,
তাঁর ইচ্ছায়।

আমি তোমার সীমানার বাইরে
নিজের জন্য একটি জায়গা বানালাম।

সেখানে তোমাকে পাওয়া যায় না।

তোমার সঙ্গে কথা নেই।

দেখা নেই।

কোনো উত্তর নেই।

শুধু স্মৃতি আছে।

আর কবিতা।

প্রথম প্রথম
সে জায়গাটি খুব নির্জন ছিল।

মনে হতো-

এখানে আমি একা।

তারপর ধীরে ধীরে
নিজের জীবনের শব্দ
সেখানে এসে ভিড় করল।

কাজ।

দায়িত্ব।

সময়।

মানুষ।

প্রতিদিনের জীবন।

আমি শিখলাম-

একটি অসম্পূর্ণ ভালোবাসাকে
বুকে রেখেও
সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে বাঁচা যায়।

এ শিক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ আমি চাই না
আমার এই কবিতাগুলো
কখনো এমন কথা বলুক-

যেন তোমাকে না-পাওয়া
আমার জীবনকে অর্থহীন করেছে।

তা সত্য নয়।

জীবন অনেক বড়।

একটি মানুষকে ভালোবাসা
তার একটি গভীর অংশ হতে পারে,

কিন্তু জীবন শুধু
একটি মানুষ নয়।

আমি বেঁচেছি।

আমার নিজস্ব আনন্দ ছিল।

নিজস্ব অর্জন।

নিজস্ব ব্যর্থতা।

নিজস্ব সম্পর্ক ও দায়িত্ব।

তুমি ছিলে
আমার স্মৃতির একটি গভীর নদী-

সমস্ত পৃথিবী নও।

হয়তো এই কারণেই
তোমাকে এত বছর মনে রেখেও
তোমার দরজায় যাইনি।

আমার জীবনকে
তোমার উত্তর পাওয়ার অপেক্ষায়
স্থির করে রাখিনি।

আমি জানতাম-

তোমার সীমানার বাইরে
আমারও একটি পৃথিবী আছে।

সেখানে আমাকে
আমার মতো করেই বাঁচতে হবে।

তবু কখনো গভীর রাতে
সেই সীমানার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে স্মৃতি।

সে বলেছে-

একবার?

একবার শুধু খবর নিই?

দেখি কেমন আছে?

আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করেছি-

এই ইচ্ছাটি কার জন্য?

তার জন্য?

নাকি আমার জন্য?

যদি শুধু আমার কৌতূহল মেটাতে
তার চাওয়া দূরত্ব ভাঙতে হয়,

তবে না।

আমি ফিরে এসেছি।

ভালোবাসা তখন
একটি নতুন ভাষা শিখল।

আগে তার ভাষা ছিল-

“দেখতে চাই।”

তারপর হলো-

“কথা বলতে চাই।”

আরও পরে-

“তোমাকে চাই।”

শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়াল-

“তোমার শান্তি নষ্ট করতে চাই না।”

এই শেষ বাক্যটি বলতে
আমার বহু বছর লেগেছে।

তোমার সীমানার বাইরে থেকে
আমি একসময় বুঝলাম-

ভালোবাসা সবসময়
দুটি মানুষের মাঝের সম্পর্ক নয়।

কখনো সেটি
নিজের ভেতরের একটি নৈতিক অবস্থানও।

আমি কাউকে ভালোবাসি-

তাই তার স্বাধীনতা
আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

আমি তাকে ভালোবাসি-

তাই তার অস্বস্তিকে
ছোট করে দেখব না।

আমি তাকে ভালোবাসি-

তাই সে যে দরজা বন্ধ করেছে
তার সামনে বারবার
কড়া নাড়ব না।

এই কবিতাগুলো লিখছি-

এটিও তাই
তোমার সীমানার ভেতরে প্রবেশ নয়।

এগুলো তোমার কাছে
কোনো দাবি বহন করে না।

এরা আমার স্মৃতির দলিল।

আমার তরুণ বয়সের সঙ্গে
আমার আজকের বয়সের কথোপকথন।

তুমি এখানে আছো
কারণ তুমি সত্যিই
সেই স্মৃতির অংশ।

কিন্তু তোমাকে
এই কবিতার উত্তরদাতা হতে হবে না।

আজ প্রায় ষাটের কাছে এসে
সীমানা শব্দটি
আর কষ্টের মনে হয় না।

বরং কখনো মনে হয়-

এই সীমানাটিই হয়তো
আমার অনুভূতিকে
অন্য এক রূপ দিয়েছে।

যদি আমি বারবার
তোমাকে খুঁজে বেড়াতাম,

যদি তোমার কথাকে উপেক্ষা করতাম,

যদি নিজের আকাঙ্ক্ষাকে
তোমার ইচ্ছার ওপরে রাখতাম-

তবে আজ
এই দীর্ঘ অনুভূতিকে
ভালোবাসা বলতে
আমার সংকোচ হতো।

তুমি আমাকে একটি দূরত্ব দিয়েছিলে।

সময় সেই দূরত্বকে
বছরে পরিণত করেছে।

এক বছর।

পাঁচ।

দশ।

বিশ।

প্রায় ত্রিশ।

দূরত্ব এত দীর্ঘ হয়েছে
যে এখন আমাদের মাঝখানে
শুধু রাস্তা বা শহর নয়-

একটি সম্পূর্ণ জীবনকাল দাঁড়িয়ে।

তবু দূরত্বের একটি
আশ্চর্য ক্ষমতা আছে।

সে মানুষকে বুঝিয়ে দেয়-

কোন জিনিসটি কাছে থাকার
অভ্যাস ছিল,

আর কোনটি সত্যিই
হৃদয়ে ছিল।

অনেক কিছু
দূরে গেলে মুছে যায়।

তুমি পুরোপুরি মুছে যাওনি।

কিন্তু তোমাকে মনে থাকা মানেই
তোমার কাছে ফিরে যাওয়ার
অধিকার তৈরি হয় না।

এই দুটি সত্য
আমি পাশাপাশি রাখতে শিখেছি।

আজ যদি কখনো
দূর থেকে তোমাকে দেখি-

হয়তো কোনো ছবিতে,
কোনো স্মৃতির হঠাৎ দরজায়-

আমি প্রথমে সময়কে দেখি।

ভাবি-

এই কি সেই মানুষ
যাকে একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে
প্রথম দেখেছিলাম?

তারপর নিজের মুখের দিকেও তাকাই।

আমরাও তো আর
সেই দুজন নই।

সময় আমাদের দুজনের ওপরই
তার দীর্ঘ স্বাক্ষর রেখেছে।

তবু আমার ভেতরে
একটি জায়গায়
সীমানাটি এখনো আছে।

আমি তার এপাশে দাঁড়িয়ে
তোমাকে বলি না-

ফিরে এসো।

বলিও না-

আমাকে মনে রেখো।

এমনকি এটিও বলি না-

আমার কবিতা পড়ো।

শুধু মনে মনে বলি-

তুমি ভালো থেকো।

এই চারটি শব্দের মধ্যে
এখন আমার প্রায় সমস্ত
ভালোবাসা এসে আশ্রয় নিয়েছে।

তোমার সীমানার বাইরে
এত বছর দাঁড়িয়ে থেকে
আমি একটি কথা শিখেছি-

দূরত্ব সবসময়
প্রেমের বিপরীত নয়।

কখনো দূরত্বই
প্রেমকে তার সবচেয়ে কঠিন
সত্যটি শেখায়-

যাকে ভালোবাসি,
তার জীবনে আমার জন্য জায়গা থাকতেই হবে-
এমন কোনো নিয়ম নেই।

কিন্তু আমার হৃদয়ে
তার জন্য একটি জায়গা আছে-

সেটি রাখব কি না,
সেটি আমার দায়িত্ব।

আমি রেখেছি।

চুপচাপ।

তোমার সীমানার বাইরে।

কোনো দরজা না ঠেলে,
কোনো উত্তর না চেয়ে,
কোনো অধিকার ঘোষণা না করে।

শুধু কখনো কোনো রাতে
পুরোনো পাণ্ডুলিপির হারানো শব্দেরা
ফিরে এলে লিখেছি-

“তুমি তোমার পৃথিবীতে স্বাধীন থেকো;
আমি আমার পৃথিবীতে তোমার স্মৃতিটুকু রাখি।
দুটি পৃথিবীর মাঝখানে যে সীমানা তুমি এঁকেছিলে,
আমার ভালোবাসা আজও তার কাছে এসে থামে-
কিন্তু তাকে অতিক্রম করে না।”

শেষবার সামনে থেকে

শেষবার তোমাকে সামনে থেকে দেখার দিনটি
আজও কি ঠিকমতো মনে আছে?
না-সবটা নয়।

স্মৃতি কিছু রেখেছে,
কিছু মুছে দিয়েছে।

তবু একটি অনুভূতি অক্ষত-

সেদিন বুঝিনি
এটি এত দীর্ঘ না-দেখার শুরু হবে।

তুমি সামনে ছিলে।

আমি তাকিয়েছিলাম।

হয়তো কথা হয়েছিল,
হয়তো হয়নি।

হয়তো চোখে চোখ পড়েছিল,
হয়তো আমি আবারও
আগের মতো চোখ সরিয়ে নিয়েছিলাম।

কিন্তু একটি কথা নিশ্চিত-

আমি তখনও জানতাম না,
এই দৃশ্যটি
আমার স্মৃতিতে শেষ দৃশ্য হয়ে থাকবে
দশকের পর দশক।

মানুষের জীবনে
শেষবারগুলো প্রায় কখনোই
“শেষবার” বলে আসে না।

শেষবার ক্লাসে যাওয়া,
শেষবার কোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা,
শেষবার কোনো পুরোনো বাড়িতে প্রবেশ-

সবকিছু ঘটে
একটি সাধারণ দিনের মতো।

পরে বুঝি-

ওটাই ছিল শেষ।

তোমার ক্ষেত্রেও তাই।

আমি যদি জানতাম
সেদিনের পরে তোমাকে
সামনে থেকে আর বহু বছর দেখব না,

তাহলে কি আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতাম?

হয়তো।

কিন্তু তোমার অস্বস্তির বিনিময়ে নয়।

আমি শুধু দৃশ্যটিকে
আরও মন দিয়ে মনে রাখতাম।

তোমার মুখের রেখা।

তোমার চোখ।

তোমার কণ্ঠ।

তোমার হেঁটে যাওয়ার ভঙ্গি।

সব।

কিন্তু মানুষ ভবিষ্যৎ জানে না।

তাই আমি সাধারণভাবেই ফিরে এসেছিলাম।

হয়তো মনে হয়েছিল-

আবার কখনো দেখা হবে।

এই তো একই শহর,
একই পৃথিবী।

কোথায় যাবে মানুষ?

আজ এত বছর পরে
এই প্রশ্ন শুনলে
সময় যেন মৃদু হেসে ওঠে।

মানুষ একই পৃথিবীতে থেকেও
এক জীবনের দূরত্বে চলে যেতে পারে।

তারপর সত্যিই দূরত্ব এল।

প্রথমে দিন।

তারপর মাস।

তারপর বছর।

একসময় “শেষবার দেখা”
একটি স্মৃতি হয়ে গেল।

আর সেই স্মৃতির ওপর
সময় ধুলো ফেলতে লাগল।

কিন্তু পুরোপুরি ঢাকতে পারল না।

কখনো মনে হয়েছে-

শেষবার তোমার মুখে
কী অভিব্যক্তি ছিল?

তুমি কি ক্লান্ত ছিলে?

শান্ত?

অভিমানী?

নাকি একেবারেই স্বাভাবিক?

জানি না।

স্মৃতি কখনো কখনো
অনুভূতি ধরে রাখে,
দৃশ্যের সূক্ষ্মতা নয়।

আমি শুধু জানি-

সেদিন তোমাকে সামনে থেকে দেখেছিলাম।

তারপর দীর্ঘ শূন্যতা।

আজ যদি সেই দিনটি
আবার ফিরে পেতাম,
আমি কিছু বদলাতে চাইতাম না।

কারণ তোমার সিদ্ধান্ত
তোমারই ছিল।

আমার কাজ ছিল
সেই সিদ্ধান্তের পরে
নিজেকে সরিয়ে নেওয়া।

তাই শেষবার দেখা
কোনো অসমাপ্ত দাবির দৃশ্য নয়।

বরং একটি সীমানার আগে
শেষ মানবিক মুহূর্ত।

আমি আজও সেই দিনের দিকে
অভিযোগ নিয়ে তাকাই না।

বরং কৃতজ্ঞতা নিয়ে ভাবি-

শেষবার দেখেছিলাম।

স্মৃতি পেয়েছিলাম।

একটি মুখ
আমার জীবনের এক অংশ হয়ে
থেকে গিয়েছিল।

সময়ের কাছে
আমার শুধু একটি অনুরোধ ছিল যেন-

মুখটি পুরোপুরি মুছে দিও না।

কিছু রেখো।

একটু আলো।

একটু দৃষ্টি।

একটি বিকেল।

একটি হাঁটা।

এইটুকুই।

সময় সব শোনেনি।

অনেক কিছু নিয়ে গেছে।

তবু কিছু রেখেছে।

আজ যদি আয়নায় নিজের মুখ দেখি
এবং সময়ের রেখা দেখি,

ভাবি-

তোমার মুখেও নিশ্চয়ই
সময় তার দীর্ঘ স্বাক্ষর রেখেছে।

আমরা দুজনেই বদলেছি।

শুধু আমার স্মৃতির শেষ দৃশ্যটি
বদলায়নি।

সেখানে তুমি
এখনও সেই বয়সে।

আমি এখনও সেই মানুষ।

কী অদ্ভুত-

বাস্তবের মানুষ বয়স বাড়ায়,
স্মৃতির মানুষ নয়।

তাই আমার মনে
শেষবারের তুমি
আজও দাঁড়িয়ে আছো
একটি স্থির বিকেলের মধ্যে।

আর আমি জানি-

কোনোদিন যদি আবার দেখা হয়,
সেটি আর সেই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হবে না।

আমরা দুজনেই হব
দীর্ঘ সময় পেরোনো দুই মানুষ।

তাই শেষবারের সেই মুখ
আমি আর বাস্তবের সঙ্গে
মেলাতে চাই না।

দুই সময়কে
দুই সময়ের মতোই থাকতে দিই।

শেষবার সামনে থেকে
তোমাকে দেখেছিলাম-

এই বাক্যটির মধ্যে
কত বছর জমে আছে।

কত না-বলা কথা।

কত ঋতু।

কত পরিবর্তন।

কত জীবন।

আজ শুধু মনে মনে বলি-

সেদিন বুঝিনি
তুমি আমার চোখের সামনে থেকে
এত দীর্ঘ সময়ের জন্য সরে যাচ্ছ।
কিন্তু ভালোই হয়েছে-
যদি জানতাম, হয়তো বিদায়টাকে ভারী করতাম।
তুমি সাধারণভাবেই চলে গিয়েছিলে,
তাই স্মৃতিটিও আজও
একটি সাধারণ বিকেলের মতোই সুন্দর।